![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর আলজাজিরার।
বুধবার (১২ আগস্ট) এশিয়ার বাজারে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছেছে। অক্টোবর সরবরাহের ব্রেন্ট ফিউচার ৮৯ দশমিক ৬১ ডলারে লেনদেন হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে ব্রেন্টের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা ধীর হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতার ঘটনা তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, হরমুজ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে এ বিষয়ে বাজারের আস্থা আগের তুলনায় স্পষ্টতই কমেছে।
বাব আল-মান্দাবে জাহাজে হামলা
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার অভিযোগ করেছে, বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্যও রয়েছেন।
এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
হরমুজ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা
গত কয়েক দিন ধরে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কাছ থেকে পরস্পর ভিন্ন ধরনের বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। দ্রুততম সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে দোহা।
তবে তেহরান বলছে, ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা সরাসরি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান ইতিবাচক নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মাত্র ১০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। অথচ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত।
বিশ্ব তেল সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে প্রণালিতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরবরাহ ব্যাহত হলে জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্যেও।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সংস্থাটি ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
৮৫–৯০ ডলারে থাকতে পারে তেলের দাম
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহের মতে, হরমুজ প্রণালিতে উভয় দিকের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকতে পারে।
তার ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে।
ফলে হরমুজ প্রণালি দ্রুত স্বাভাবিক হবে কি না, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা কতটা কমবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় কোনো সমঝোতা আসে কি না—এসব বিষয়ই এখন বৈশ্বিক তেলবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।