![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতে শিক্ষা সংস্কারের দাবি ও রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বিজেপি-সমর্থক বাবা-মায়ের দূরত্ব বাড়ছে। সাম্প্রতিক জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে ঘিরে দেশটির বিভিন্ন পরিবারে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখন ব্যক্তিগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিদ্বেষের রাজনীতির সমালোচনা করে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন।
পাঞ্জাবের ১৯ বছর বয়সী কুনাল চৌধুরীর ঘটনাটি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে যোগ দিতে ১৪ জুলাই লুধিয়ানা থেকে দিল্লি যান তিনি। আন্দোলন শেষ হলেও আর বাড়ি ফেরেননি কুনাল। তার ভাষ্য, দিল্লিতে এসে আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
কুনালের বাবা বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। একসময় তিনিও আরএসএসের সদস্য ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের অভিজ্ঞতার পর সেই রাজনৈতিক পরিচয় থেকে সরে এসেছেন তিনি। তার মতে, আন্দোলনের জায়গায় জাত, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল, যা তার আগের রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করেছে।
শিক্ষা আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক প্রশ্ন
ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা দিল্লিতে জড়ো হন। আন্দোলনকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা বন্ধ, ভর্তি পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান।
দীর্ঘদিন চলা আন্দোলনের একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়। আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে সরকারও ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়।
এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের মতো কুনালের কাছেও বিষয়টি কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনের পরিবেশ তাকে রাজনীতি, সামাজিক বিভাজন এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কুনাল জানান, পরিবারে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে তার সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিনি এখন নিজের পড়াশোনা শেষ করতে চান এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ খুঁজছেন।
ধর্ম ও জাত নিয়ে মতপার্থক্য
কুনালের বক্তব্য অনুযায়ী, আরএসএসের সঙ্গে তার পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকলেও তিনি ছোটবেলা থেকেই সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানসিকভাবে পুরোপুরি একাত্ম হতে পারেননি। আন্দোলনে এসে বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণির মানুষের মধ্যে সহযোগিতার যে পরিবেশ দেখেছেন, সেটি তার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে।
আন্দোলনের সময় মুসলিম তরুণ মোহাম্মদ জুনাইদসহ অনেককে বিক্ষোভকারীদের খাবার ও পানি সরবরাহ করতে দেখা যায়। কুনালের কাছে এই পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার বক্তব্য, আন্দোলনের জায়গায় মানুষ জাত, ধর্ম কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা হয়নি। বরং একই দাবিতে সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি।
বাবার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে প্রিয়ারও
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী প্রিয়া সিং। তার বাবা বিজেপির কট্টর সমর্থক। প্রিয়া যখন দিল্লির আন্দোলনে যোগ দেন, তখন বাবার প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর।
আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় নিজের পরিচয় গোপন রাখতে মুখ ঢেকে রাখতেন প্রিয়া। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও দেখে বাবা যেন তাকে শনাক্ত করতে না পারেন—এমন আশঙ্কা ছিল তার।
প্রিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বাবার মতাদর্শগত পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বিষয়েও। তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও পরিবারের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
প্রিয়ার ভাষ্য, পরিবারের সঙ্গে থাকলে নিজের বন্ধু, পড়াশোনা কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি খুব একটা কথা বলেন না। এমনকি বাড়িতে থাকা অবস্থায় বন্ধুদের ফোনও এড়িয়ে চলেন।
বিজেপি পরিবার থেকে বামপন্থী রাজনীতিতে অঞ্জলি
দিল্লির আরেক তরুণী অঞ্জলির রাজনৈতিক যাত্রাও পরিবার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগিয়েছে। বিজেপি সমর্থক পরিবারে বেড়ে ওঠা অঞ্জলি বর্তমানে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সঙ্গে যুক্ত।
একসময় তিনি নরেন্দ্র মোদির সমর্থক ছিলেন। তবে ২০১৮ সালের পর তার রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া বন্ধ করে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলেন তিনি।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ছাত্র রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন অঞ্জলি। সাম্প্রতিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হওয়ার কথাও জানান তিনি।
অঞ্জলির মা অবশ্য মেয়ের রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং আন্দোলনের সাফল্যের পর মেয়েকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে বাবার সঙ্গে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো তীব্র।
নেহা বোরার পরিবারেও রাজনৈতিক মতভেদ
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং এআইএসএর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পারিবারিক রাজনৈতিক বিভাজন দেখা গেছে।
বোরার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা এবং বিজেপির সমর্থক। মা গৃহিণী। মেয়ের বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াকে শুরুতে পরিবার সহজভাবে নেয়নি।
তবে আন্দোলনের সময় নেহা অনশনে অংশ নিলে তার মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি থেকে দিল্লিতে ছুটে আসেন। আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের পর মেয়েকে অভিনন্দনও জানান তিনি।
অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও পারিবারিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। বরং সাম্প্রতিক আন্দোলন কিছু পরিবারে রাজনৈতিক মতভেদের পাশাপাশি নতুন ধরনের আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের দূরত্ব কেন বাড়ছে
ভারতের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রজন্মগত চিন্তার পার্থক্য এ ধরনের সংঘাতের অন্যতম কারণ। বয়স্ক প্রজন্ম সাধারণত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী অবস্থান নেয়। অন্যদিকে তরুণদের আন্দোলন অনেক সময় অধিকার, মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই বিভাজনকে আরও তীব্র করছে। একই পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট দেখছেন। ফলে প্রত্যেকে নিজের মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য ও মতামতের মধ্যে আটকে পড়ছেন।
এতে পারিবারিক আলোচনার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
আন্দোলন কি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে?
সাম্প্রতিক আন্দোলন শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নই সামনে আনেনি; বরং তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছে।
একদিকে বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থক পরিবারগুলো নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ধরে রাখছে। অন্যদিকে একই পরিবারের তরুণ সদস্যদের কেউ কেউ শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় সহাবস্থান ও নাগরিক অধিকারকে সামনে রেখে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করছেন।
ফলে ভারতের রাজনীতিতে প্রজন্মগত এই মতপার্থক্য ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আন্দোলন শেষ হলেও পরিবারগুলোর ভেতরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক যে সহজে শেষ হচ্ছে না, কুনাল, প্রিয়া, অঞ্জলি ও নেহাদের অভিজ্ঞতা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।