• হোম > অর্থনীতি > রিজার্ভ চুরির তদন্ত কেন এত দীর্ঘসূত্রতার শিকার?

রিজার্ভ চুরির তদন্ত কেন এত দীর্ঘসূত্রতার শিকার?

  • বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৫
  • ৬৪

---

আহমেদ তোফায়েল

২০১৬ সালের সেই সকালটির কথা মনে আছে? পুরো জাতি তখন এক অবিশ্বাস্য খবরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাওয়া হয়ে যায়। কিন্তু এই রিজার্ভ চুরির মামলাটি এখনো এক জায়গায় আটকে আছে। আদালত ৯৭ বারের মতো সময় দিয়েছেন তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য। প্রায় নয় বছর ধরে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি চলছে। প্রশ্ন জাগে, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো এত বড় ঘটনার তদন্ত শেষ করতে কেন ৯৭ বার সময় নিতে হয়?

ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে সময়ের গুরুত্ব অনেক। যত সময় গড়াবে, সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপ পাওয়ার আশঙ্কা তত বাড়বে। রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি কোনো সাধারণ চুরি নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ। এর পেছনে দেশের ভেতরের কোনো চক্রের যোগসাজশ থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলা হয়। এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শুরু থেকেই তদন্ত সংস্থাটি বারবার সময় চেয়েছে। কিন্তু কেন এই বিলম্ব, তার কোনো সুস্পষ্ট কারণ জনসমক্ষে আসেনি।

প্রতিটি সময়সীমা পার হওয়ার পর নতুন তারিখ নির্ধারণ যেন একটি রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ৯৭ বার পেছানোর খবর শুনলে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। সিআইডির বারবার সময় চাওয়ার অর্থ কী? এটি কি তাদের সক্ষমতার অভাব, নাকি তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অদৃশ্য বাধা আছে? নাকি এই চুরির পেছনে থাকা শক্তিশালী গোষ্ঠীর ছায়ার কারণে তদন্ত থমকে আছে? এসব প্রশ্ন এখন মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো দেশের আর্থিক শক্তির কেন্দ্র। সেই কেন্দ্র থেকে অর্থ চুরির ঘটনার পর যে কঠোরতার প্রয়োজন ছিল, তা তদন্তে দেখা যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমার বিষয়টি এতবার পেছানোর পরও কোনো ফলাফল আসেনি। এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে।

ঘটনাটির পেছনে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা এবং ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ব্যাংকিং খাতের জটিলতা রয়েছে। এসব বিষয় সামনে এলেও স্থানীয় পর্যায়ের তদন্তের গতি কেন শ্লথ, তার জবাব প্রয়োজন। বারবার সময় বাড়ানোর এই সংস্কৃতি তদন্তকারী সংস্থার দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি অপরাধীদের এক ধরনের অদৃশ্য নিরাপত্তা দেয়াল তৈরি করে দেয়। বিচারহীনতার এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের উৎসাহিত করার সমান।

আমরা প্রায়ই শুনি, তদন্ত চলছে বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু দশক পেরিয়ে গেলেও যখন প্রতিবেদন জমা দেওয়া যায় না, তখন বুঝতে হয় পরিকল্পনায় বড় গলদ আছে। আধুনিক যুগে সাইবার ফরেনসিক এবং আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েও যদি তদন্ত শেষ না হয়, তবে এর দায় কার?

যদি সিআইডি নিজেরাই এই কাজ করতে সক্ষম না হয়, তবে সরকার কেন বিকল্প পথ খুঁজছে না? ইন্টারপোল বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকলে তা স্পষ্ট করা দরকার। বিচার বিভাগের উচিত এই মামলাটি বিশেষভাবে মনিটরিং করা। অনির্দিষ্টকালের জন্য সময় বাড়িয়ে দেওয়া বিচার চাওয়ার অধিকারের পরিপন্থী। আদালত নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, না হলে ব্যর্থতার দায় সংস্থাকে নিতে হবে।

ভবিষ্যৎ করণীয় কী:

রিজার্ভ চুরির এই ঘটনা একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর প্রশ্নচিহ্ন। এই পরিস্থিতির অবসান প্রয়োজন। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি। যারা এই বিলম্বের জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। তদন্ত প্রতিবেদন জমার নামে এই সময়ক্ষেপণ বন্ধ করা উচিত। মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়। ৯৭ বার সময় পিছিয়ে দেওয়ার ইতিহাস যেন ১০০ বার পর্যন্ত গড়ায় না। মানুষ চায় এই ঘটনার পেছনে থাকা মানুষের পরিচয় প্রকাশ হোক। বিচার হোক এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। রিজার্ভ চুরি মামলার নিষ্পত্তি কেবল আইনি দাবি নয়, এটি দেশের মর্যাদা রক্ষারও অংশ। বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পেশাদারত্ব দেখাবে—এটাই সবার প্রত্যাশা। ৯৮ নম্বরবার যেন আর সময়ের আবেদন না হয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15146 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 12:48:50 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh