• হোম > অর্থনীতি > সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ঘাটতি, দরিদ্রের ৬৭% সুবিধার বাইরে

সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ঘাটতি, দরিদ্রের ৬৭% সুবিধার বাইরে

  • মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫১
  • ৪৬

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প বরাদ্দ, সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে না পারা এবং একাধিক বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির সমস্যায় ভুগছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণকেন্দ্রিক প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে সরকারের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় অনেক কম।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্য বিমোচনকেন্দ্রিক মূল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ ব্যয় করে। বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ খাতে গড় ব্যয় ৩.৮ শতাংশ।

শুধু বরাদ্দের ঘাটতিই নয়, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো নিয়েও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৬৭.১ শতাংশই সামাজিক সুরক্ষার সুবিধার বাইরে ছিল।

অন্যদিকে, যারা বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পেয়েছেন, তাদের ৬২.৮ শতাংশই দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। ফলে একদিকে প্রকৃত দরিদ্ররা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থ এমন মানুষের পেছনে ব্যয় হচ্ছে, যাদের সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) আয়োজিত এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো সংক্রান্ত জাতীয় সম্মেলনের ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও এসডিজি অর্জন’ শীর্ষক সমান্তরাল অধিবেশনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিধবা ভাতায় ৮৫ শতাংশ যোগ্য মানুষ বাদ

জিইডির মূল্যায়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ পড়ার হার বা ‘এক্সক্লুশন রেট’ নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের উদাহরণ অনুযায়ী, বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে প্রকৃত যোগ্য মানুষের বাদ পড়ার হার ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এই কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়ার যোগ্য বিপুলসংখ্যক মানুষ সুবিধাভোগীর তালিকাতেই জায়গা পাননি।

এ ধরনের বাদ পড়ার ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য নির্ধারিত সরকারি সহায়তা যদি তাদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।

অযোগ্যরাও পাচ্ছেন সরকারি সুবিধা

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনভিপ্রেত অন্তর্ভুক্তি বা ‘ইনক্লুশন’। অর্থাৎ, প্রকৃত দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন।

জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সুবিধাভোগীদের ৬২.৮ শতাংশ দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নন। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থের একটি বড় অংশ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে সরকারি সম্পদের অপচয় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ ধরনের ‘এলিট ক্যাপচার’ ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেও আরও স্পষ্ট করছে।

৯৫ কর্মসূচিতে ছড়িয়ে আছে বরাদ্দ

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা হলো কর্মসূচির অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতা। মূল অর্থায়ন ৯৫টি ওভারল্যাপিং বা কাছাকাছি ধরনের একাধিক কর্মসূচির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।

এর মধ্যে ছোট আকারের ৫০টি কর্মসূচির পেছনে মোট বরাদ্দের মাত্র ২.৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বিক্ষিপ্ত এই কাঠামোর কারণে বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ এবং সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়নও কঠিন হয়ে পড়ছে।

শহরের দরিদ্ররা আরও পিছিয়ে

সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় শহরের দরিদ্র মানুষের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে জিইডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

বর্তমানে দেশে ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ২৩টি বিশেষভাবে শহরের মানুষের জন্য তৈরি। এসব কর্মসূচিতে সামাজিক সুরক্ষার মোট বরাদ্দের মাত্র ৪ শতাংশ ব্যয় করা হয়।

ফলে শহরের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র পরিবার, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অর্থনৈতিক চাপে থাকা পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর এবং নগর অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর বড় একটি জনগোষ্ঠীর নির্ভরতার কারণে শহুরে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৬-৩১ মেয়াদে নতুন কৌশল

বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদের জন্য নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের দুর্বলতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১ ও ১০ নম্বর লক্ষ্য—দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈষম্য হ্রাস—এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোয় ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারি সহায়তার অপচয় কমানো, সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একই ধরনের একাধিক কর্মসূচি একীভূত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং বিশেষ করে শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাবে।

দারিদ্র্য বাড়ায় সংস্কারের প্রয়োজন আরও জরুরি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ধাক্কার প্রভাব দারিদ্র্যের ওপরও পড়েছে। জিইডির প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মধ্যম দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৬ শতাংশ।

তবে ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যম দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৯.৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়তে থাকায় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জিইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা, অযোগ্যদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, শহুরে দরিদ্রদের জন্য কার্যকর কর্মসূচি তৈরি এবং বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে সমন্বিত করার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15136 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 04:56:58 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh