![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিলের সংখ্যা নতুন রেকর্ডের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের মার্কিন ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ তথ্য প্রকাশ করে। তবে ২০২৬ সালের ভিসা বাতিলের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কিংবা কোন ধরনের ভিসা বা কোন কোন দেশের নাগরিকদের ভিসা বেশি বাতিল হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার অতিরিক্ত ভিসা বাতিল হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো, প্রতারণা, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার, মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ১ লাখের বেশি মার্কিন ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। বার্ষিক হিসাবে এটিই ছিল সর্বোচ্চ রেকর্ড। তবে বর্তমান গতিতে ভিসা বাতিল অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করেই ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে বাতিল হওয়া ভিসার ধরন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্বভিত্তিক কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, অপরাধের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের ভিসা বাতিলের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এসব অপরাধের মধ্যে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ রয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, যৌন নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, জালিয়াতি, আত্মসাৎ ও অন্যান্য অপরাধের কারণেও ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ভিসাও বাতিল
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। একই সময়ে বিশেষায়িত পেশায় কর্মরত প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যক্তির ভিসাও বাতিলের তালিকায় ছিল।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ভিসা নীতির আওতায় শুধু অবৈধ অভিবাসন নয়, বৈধ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বার্থ ট্যুরিজমের বিরুদ্ধেও কড়াকড়ি
ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস থেকে বার্থ ট্যুরিজমের অভিযোগে শতাধিক ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করার বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন বার্থ ট্যুরিজম চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার এবং এ ধরনের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আদালতে বড় বাধার মুখে পড়েছে। গত ৩০ জুন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি উদ্যোগ খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী অবৈধ বা সাময়িকভাবে অবস্থানরত অভিভাবকদের সন্তানরাও যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে জন্মসূত্রে নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে।
অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর ট্রাম্প প্রশাসন
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রভাব পড়েছে ভিসা, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি নাগরিকদের অবস্থানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
বৈধ অভিবাসন সীমিত করার উদ্যোগ হিসেবে এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি বাড়ানোর প্রস্তাবসহ বিদেশি শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য ভিসা নীতি কঠোর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এইচ-১বি ভিসার ফি ১ লাখ মার্কিন ডলার নির্ধারণের উদ্যোগও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একটি কেন্দ্রীয় আদালত পরে এ ফি বাতিলের আদেশ দেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই আদেশ স্থগিতের আবেদনও আদালতে প্রত্যাখ্যাত হয়।
অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা বাতিলের এই ধারাকে কেউ কেউ জননিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অতীতের আইনি জটিলতা বা ছোটখাটো অপরাধের ঘটনাকেও ব্যবহার করে অভিবাসীদের ওপর কঠোর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান ভিসা ও অভিবাসন নীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। ভিসা বাতিলের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা বাতিলের বার্ষিক সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।