![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর সেতু ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাল্টা হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা একটি ফোনালাপের রেকর্ডে তিনি আন্দোলনকারীদের বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার কথা বলেছেন বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের মধ্যে ওই ফোনালাপের রেকর্ড প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এই মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ফোনালাপে কী বলা হয়েছে
প্রসিকিউশনের দাখিল করা রেকর্ড অনুযায়ী, ফোনালাপের একপর্যায়ে হাছান মাহমুদ শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন। পরে আলোচনায় ওবায়দুল কাদেরও যুক্ত হন।
ফোনালাপের রেকর্ডে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দিচ্ছে এবং এর জবাবে তাদের বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার কথা।
রেকর্ডে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওরা আগুন দিয়ে পোড়াবে, তো তাদের বাড়ি-গাড়ি আছে। এখন সেগুলো পাবলিক দিয়ে পোড়াবে, আর কী করবে।’
এরপর তিনি আরও বলেন, ‘তোরাও পোড়াবি আয়, আমরাও পোড়াব।’
ফোনালাপে হাছান মাহমুদ শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করেন বলে রেকর্ডে শোনা যায়। তিনি একপর্যায়ে এটিকে ‘টিট ফর ট্যাট’ বা পাল্টা জবাব দেওয়ার কৌশল হিসেবেও উল্লেখ করেন।
সেতু ভবনে আগুনের প্রসঙ্গ
ফোনালাপের আরেক অংশে রাজধানীর সেতু ভবনে আবারও আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসে। সেখানে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, বিভিন্ন এলাকায় জমায়েতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র্যাব পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে যারা আগুন দিচ্ছে, তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও ফোনালাপে উঠে আসে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।
রেকর্ড অনুযায়ী, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান নেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে ডেকে নিজ নিজ এলাকায় ‘প্রটেকশন’ দেওয়ার কথাও বলেন বলে ফোনালাপে শোনা যায়।
ওবায়দুল কাদের ওই সময় শেখ হাসিনার বক্তব্যে সম্মতি জানান বলে রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে।
সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আরও ছয়জন আসামি রয়েছেন।
তারা হলেন—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
মামলার শুনানিতে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদের ওই ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানোর কথা রয়েছে।
যুক্তিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ফোনালাপ
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ফোনালাপের রেকর্ডটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও পাল্টা সহিংসতার বিষয়ে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা ও অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
তবে ফোনালাপের রেকর্ডের সত্যতা, প্রেক্ষাপট এবং এর আইনগত গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মূল্যায়নের বিষয়। মামলার পরবর্তী শুনানি ও যুক্তিতর্কে এ বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপিত হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। মঙ্গলবারের শুনানিতে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্কে ফোনালাপের এই অংশ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।