• হোম > অর্থনীতি > মার্কিন শুল্কের রিফান্ডে ক্ষতিপূরণ চান বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকেরা

মার্কিন শুল্কের রিফান্ডে ক্ষতিপূরণ চান বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকেরা

  • মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩৪
  • ৭৪

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারককে পণ্যের দাম কমাতে হয়েছিল। বড় মার্কিন ক্রেতাদের অর্ডার ধরে রাখতে কেউ কেউ বাড়তি শুল্কের খরচের একটি অংশ নিজেদের ওপর নিয়েছিলেন। তখন ব্যবসা ও রপ্তানি আদেশ ধরে রাখাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

তবে এখন সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের একটি বড় অংশ অবৈধ ঘোষণা করার পর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলো পরিশোধ করা শুল্কের অর্থ ফেরত পেতে শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশের যেসব পোশাক রপ্তানিকারক ওই সময় শুল্কের বাড়তি খরচের অংশ বহন করেছিলেন, তারা এখন সেই রিফান্ডের একটি অংশ পাওয়ার দাবি তুলছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। এর মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে আমদানিকারকদের ফেরত দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—মার্কিন ক্রেতারা যখন সরকারের কাছ থেকে শুল্কের টাকা ফেরত পাচ্ছেন, তখন সেই ব্যয়ের অংশ বহন করা সরবরাহকারীদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া হবে?

শুল্কের খরচ ভাগ করে নিয়েছিলেন রপ্তানিকারকেরা

মার্কিন বাজারে ব্যবসা ধরে রাখতে ২০২৫ সালে অনেক বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারককে মূল্যছাড় দিতে হয়েছিল। বিশেষ করে বড় বায়াররা অর্ডার বহাল রাখার শর্ত হিসেবে পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুল আলম চৌধুরী জানান, ওই সময়ে তারা কোনো কোনো বায়ারের সঙ্গে বাড়তি মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ, আবার কোথাও অর্ধেক পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছিলেন।

এখন শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তারা বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বায়ারদের পক্ষ থেকেও অর্থ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

এইচকেসি অ্যাপারেলসের মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। ফলে মার্কিন শুল্কনীতির পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

সরাসরি রিফান্ড নয়, বিকল্প সমাধানও চান ব্যবসায়ীরা

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সরাসরি অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলেও অন্য উপায়ে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্ডারে পণ্যের দাম কিছুটা বাড়ানো, অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানো, জরুরি এয়ার শিপমেন্টে খরচ কমানো কিংবা পেনাল্টিতে ছাড় দেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকতে পারে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, শুল্কের চাপ সামলাতে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ কম নেওয়া হয়েছিল, রিফান্ড পাওয়া অর্থের একটি অংশ থেকে হলেও তা ফেরত দেওয়া উচিত।

তবে সব রপ্তানিকারক সরাসরি টাকা ফেরত পাওয়ার আশা করছেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতে মার্কিন বায়ারদের কাছ থেকে অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানো হলে আগের আর্থিক ক্ষতি ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ঢাকাভিত্তিক একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এক মার্কিন বায়ার তাদের কাছে ৫ শতাংশ মূল্যছাড় চেয়েছিলেন। তারা ১ শতাংশ দাম কমিয়ে দেওয়ায় প্রায় ২৫ হাজার ডলার ছাড় দিতে হয়েছিল। তবে ওই অর্থ সরাসরি ফেরত চাওয়ার পরিবর্তে ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিমাণ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছেন তিনি।

এলডিপি পদ্ধতিতে রিফান্ডের সুযোগ

শুল্কের বোঝা বহনের ক্ষেত্রে ‘ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড’ বা এলডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়টি আলাদা। এই পদ্ধতিতে আমদানিকারক দেশের কাস্টমস শুল্কের দায় সরবরাহকারীর ওপরও পড়তে পারে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, এলডিপি পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানগুলো আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে শুল্কের অর্থ ফেরতের দাবি করার সুযোগ পেতে পারে।

তিনি জানান, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনজীবী বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে মোট কত শতাংশ পোশাক এলডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিজিএমইএর ধারণা, এর পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম। কারণ অধিকাংশ বাংলাদেশি পোশাক এফওবি বা ‘ফ্রি অন বোর্ড’ পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়।

বায়ার প্রতিনিধিরাও ক্ষতিপূরণের পক্ষে

বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা কয়েকটি মার্কিন ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, কোনো সরবরাহকারী যদি শুল্কের বাড়তি খরচের অংশ বহন করে থাকেন এবং সেই অর্থের রিফান্ড বায়ার পেয়ে থাকেন, তাহলে সরবরাহকারীদেরও কোনো না কোনোভাবে সুবিধা দেওয়া উচিত।

তবে সরাসরি অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা থাকতে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশে পণ্যের দাম সমন্বয় করে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়াকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশি সরবরাহকারীর জরুরি কোনো চালান বিমানে পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিবহন ব্যয়ে ছাড় দেওয়া কিংবা কোনো কারণে পেনাল্টি হলে সেটি কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও আগের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রপ্তানিকারকদের ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই

রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা মোট কত অর্থের ক্ষতি বহন করেছেন, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর কাছে।

বিজিএমইএর এক নেতা জানান, সব মার্কিন বায়ার রপ্তানিকারকদের ওপর একই ধরনের চাপ দেননি। কেউ কেউ কোনো মূল্যছাড় চাননি, আবার কেউ কেউ বাড়তি শুল্কের খরচ ভাগ করে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন।

তার ধারণা, সার্বিকভাবে রপ্তানিকারকদের বহন করা বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নয় এবং প্রতিষ্ঠানভেদে ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের চাপ

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাণিজ্য ঘাটতির যুক্তি দেখিয়ে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের পণ্যের ওপরও উচ্চহারে অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় শুল্কের হার পরিবর্তন করা হয়।

মার্কিন আমদানিকারকেরাই আনুষ্ঠানিকভাবে শুল্ক পরিশোধ করলেও বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, অনেক বায়ার অর্ডার ধরে রাখার শর্ত হিসেবে তাদের সঙ্গে এই বাড়তি খরচ ভাগ করে নেওয়ার চাপ দিয়েছিলেন।

অর্ডার বাতিল হওয়া ঠেকাতে এবং কারখানার উৎপাদন ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা চালু রাখতে অনেক রপ্তানিকারক তখন মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হন।

এখন মার্কিন আমদানিকারকেরা শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা সেই ক্ষতির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন। সরাসরি অর্থ ফেরত, ভবিষ্যৎ অর্ডারে মূল্য সমন্বয় কিংবা ব্যবসার পরিমাণ বাড়ানো—যেকোনো উপায়ে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ বিষয়ে বায়ার ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সমঝোতা হলে তা দুই পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কও আরও শক্তিশালী করতে পারে।

#entrepreneurbd #RMG #BangladeshGarments #GarmentsExport #মার্কিনবাজার #তৈরিপোশাক #রপ্তানি #রেসিপ্রোকালট্যারিফ #বাংলাদেশঅর্থনীতি


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15106 ,   Print Date & Time: Thursday, 1 October 2026, 08:12:14 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh