• হোম > অর্থনীতি > এস আলম সংশ্লিষ্ট ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণা

এস আলম সংশ্লিষ্ট ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণা

  • সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:০০
  • ৫৪

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে এস আলম সংশ্লিষ্ট চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর বা Non-Viable ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় এনে রেজল্যুশন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

অকার্যকর ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।

রেজল্যুশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চার প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (CEO) নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও রেজল্যুশন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের Administrator ও Associate Administrator হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

খেলাপি ঋণে ভয়াবহ অবস্থা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় চার প্রতিষ্ঠানেই চরম আর্থিক দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে।

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপোর্টফোলিওর প্রায় পুরো অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে ঋণ থেকে নিয়মিত আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন করে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পিকে হালদার কেলেঙ্কারির যোগসূত্র

এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আর্থিক সংকটের সঙ্গে বহুল আলোচিত পিকে হালদার কেলেঙ্কারির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার তথ্য অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে এফএএস ফাইন্যান্স থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেও পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আর্থিক সংকটের ভয়াবহতা বোঝা যায় ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের চিত্র থেকেও। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্য ছিল মাত্র প্রায় ৪৩৭ কোটি টাকা। ফলে কাগজে থাকা বিপুল ঋণের বড় অংশ বাস্তবে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘ সংকটে আভিভা ফাইন্যান্স

আভিভা ফাইন্যান্সও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তন আনার পরও আর্থিক দুর্বলতা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকেও রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায়, ঋণ এবং ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

সংকটে পুরো NBFI খাত

শুধু এই চার প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা NBFI খাতও দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ৩০টি এনবিএফআইয়ের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ খাতটির মোট ঋণের প্রায় ৪১ শতাংশই খেলাপি।

এই পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও পদক্ষেপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমানতকারীদের অর্থ ফেরতই বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ব্যাংকের এবারের সিদ্ধান্তের লক্ষ্য শুধু দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নয়। বরং অবশিষ্ট সম্পদ সংরক্ষণ, অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষাও রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কতটা সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং উদ্ধার হওয়া অর্থের কতটা আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারকে ফেরত দেওয়া যাবে।

বিশেষ করে যেসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই, সেগুলো আদায় এবং অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করা প্রশাসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ আর্থিক খাতে একটি কঠোর বার্তাও দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে শুধু নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে রেজল্যুশনের মাধ্যমে কাঠামোগত সমাধানের পথে যাওয়া হবে। এখন এই চার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হয় এবং আমানতকারীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত করা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15092 ,   Print Date & Time: Thursday, 1 October 2026, 01:59:28 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh