![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের পরও বাড়তে থাকা আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩৮ মিলিয়ন ডলার, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ আগস্ট প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্টসের তথ্য থেকে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বাড়ছে আমদানি, কমেছে রপ্তানি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) ভিত্তিতে দেশের আমদানি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, পণ্য আমদানির খরচের পাশাপাশি বিমা ও পরিবহন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে হিসাব করা সিআইএফ ভিত্তিক আমদানি পেমেন্ট ১০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি প্রায় ১ শতাংশ কমে ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
আমদানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এ ঘাটতি ছিল ২০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স বাড়লেও চাপ কাটেনি
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ অবশ্য ইতিবাচক ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে রেমিট্যান্সে এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধিও বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। ফলে চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ব্যালান্স অব পেমেন্টসের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩৮ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি হিসাবের অবস্থার বড় ধরনের অবনতি হয়েছে।
মে মাসের পর পরিস্থিতির অবনতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, চলতি হিসাবের পরিস্থিতি মে মাস পর্যন্ত তুলনামূলক ভালো থাকলেও পরবর্তী সময়ে এতে অবনতি হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার অর্থ হলো বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। এর পেছনে আমদানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি কমে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি ব্যালান্স অব পেমেন্টসে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
মনসুরের মতে, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বিনিময় হার কিছুটা শিথিল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের বিনিময় হার ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের হারের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ঈদুল আজহার পর থেকে দেশে মাসিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। এতে রেমিট্যান্সের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আর্থিক হিসাবে বড় উন্নতি
চলতি হিসাবের অবস্থার অবনতি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের আর্থিক হিসাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের অর্থবছরে এই হিসাবে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক হিসাবের অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
আর্থিক হিসাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাণিজ্য ঋণেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঋণে ৩ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরে এই হিসাবে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক অবস্থান ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্য ঋণের এই উন্নতি আর্থিক হিসাবকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাণিজ্য অর্থায়নের উন্নতির কারণে আর্থিক হিসাব শক্তিশালী হয়েছে। বাণিজ্য ঋণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক অবস্থানে এসেছে, যেখানে আগের অর্থবছরে এটি নেতিবাচক ছিল।
বাণিজ্য ঋণ বলতে সাধারণত এমন পণ্য বা সেবাকে বোঝায়, যার মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ না করে পরবর্তী সময়ে দেওয়া হয়। ব্যালান্স অব পেমেন্টসের হিসাবে এটি স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে আর্থিক হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
সামগ্রিক ব্যালান্সেও উন্নতি
চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়লেও আর্থিক হিসাবের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দেশের সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসের অবস্থায় উন্নতি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক ব্যালান্স দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক হিসাবের শক্তিশালী অবস্থানের কারণেই সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসের উন্নতি হয়েছে। এ সময়ে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে একদিকে রেমিট্যান্স ও আর্থিক হিসাবে ইতিবাচক প্রবাহ দেখা গেলেও অন্যদিকে আমদানি বৃদ্ধি, রপ্তানি কমে যাওয়া এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার কারণে চলতি হিসাবে চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য ধরে রাখা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।