![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়। ইতিহাস হলো স্মৃতি, দলিল, বিতর্ক এবং দায়ের সমন্বিত একটি বয়ান। তাই ইতিহাস যখন ছবি, প্রদর্শনী কিংবা জাদুঘরের মাধ্যমে মানুষের সামনে আসে, তখন সেখানে কী দেখানো হলো—তার পাশাপাশি কী দেখানো হলো না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
রাজধানীর মিন্টো রোডে জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত ‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। শতাধিক আলোকচিত্রে প্রায় আট দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথচলার নানা বাঁক তুলে ধরা হয়েছে। দেশভাগ থেকে পাকিস্তানি শাসন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—সবই এসেছে সেখানে। কিন্তু এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় প্রশ্ন অনুপস্থিত। ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন অবস্থান ও ভূমিকা কোথায়?
প্রদর্শনীতে ৭ মার্চের ভাষণ আছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন এবং বিজয়ের ছবি। অর্থাৎ ১৯৭১ সালকে একেবারে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহকে উপস্থাপনার একটি অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে। সমস্যাটি অন্য জায়গায়। সেই সময়কার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানকে একই ধারায় তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভূমিকা নিয়ে কোনো ছবি বা তথ্য নেই।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের বক্তব্য, একটি প্রদর্শনীর সীমিত পরিসরে সব ঘটনা তুলে ধরা সম্ভব নয়। জুলাই আন্দোলনকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় বেছে নেওয়া হয়েছে। এই যুক্তির বাস্তব ভিত্তি আছে। কোনো প্রদর্শনীই একটি দেশের পুরো ইতিহাস ধারণ করতে পারে না। সম্পাদকীয় বাছাই সব প্রদর্শনীতেই থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন বিষয়কে ‘প্রাসঙ্গিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদি প্রদর্শনীর লক্ষ্য হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা, তাহলে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই ধারাবাহিকতার বাইরের বিষয় নয়।
শুধু ছবি নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনাও:
ইতিহাসের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক থাকলে সেই দলের অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে যখন সেই অতীত একটি দেশের জন্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক, গবেষণা ও রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরা দলটির তৎকালীন অবস্থানকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে দেখেন।
মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্লেষক মফিদুল হকও মনে করেন, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা যায় না। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গাটি হলো—সে সময়ের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও ইতিহাসের অংশ।
এখানে বিষয়টি শুধু জামায়াতকে ঘিরে নয়। বরং যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কোনো দল যদি নিজের অতীতের বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে কথা বলে, সেটি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হতে পারে। কারণ ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হলে আগে সেই ভুলের মুখোমুখি হতে হয়।
প্রদর্শনীতে আরেক ধরনের অসম্পূর্ণতা:
প্রদর্শনীটির আরেকটি দিকও আলোচনার দাবি রাখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে সেখানে ‘একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইচ এম এরশাদের শাসনকে বলা হয়েছে ‘সামরিক স্বৈরশাসন’। শেখ হাসিনার শাসনামলকে উপস্থাপন করা হয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে। অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকার ও তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও সেখানে অনুপস্থিত।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ১৯৭১-এর অনুপস্থিতি নিয়ে নয়। প্রশ্নটি ইতিহাসকে কোন কাঠামোয় দেখা হচ্ছে, সেটি নিয়েও।
একটি রাজনৈতিক দল যখন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাসের প্রদর্শনী আয়োজন করে, সেখানে নিজস্ব ব্যাখ্যা থাকতেই পারে। কিন্তু তখন সেটিকে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করলে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো নিজের পছন্দের অংশের পাশাপাশি অস্বস্তিকর অংশটিও সামনে আনা। নিজের জন্য সুবিধাজনক ঘটনাকে সামনে রেখে অন্য ঘটনাকে বাদ দেওয়া হলে ইতিহাস একটি রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনিতেই নানা ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—প্রতিটি সময়ের ঘটনাকে ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।
এই বাস্তবতায় কোনো প্রদর্শনী যদি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আনে, সেটি নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। তবে সেই আলোচনার ভিত্তি হওয়া উচিত দলিল, গবেষণা ও তথ্য। রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ইতিহাসের অংশ বেছে নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি অসম্পূর্ণ ছবি পৌঁছাবে।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার:
‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ প্রদর্শনীর শেষ প্রান্তে দর্শনার্থীদের সামনে রাখা হয়েছে—‘আমরা কি পারব?’
প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে নয়। এটি ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা কি এমন একটি ইতিহাসচর্চা করতে পারব, যেখানে নিজের পছন্দের বয়ানের পাশাপাশি অস্বস্তিকর সত্যও থাকবে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়। এর মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হবে। কিন্তু সেই মূল্যায়নও টেকসই হবে তখনই, যখন তার আগে-পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একই ধারাবাহিকতায় দেখা হবে।
একটি প্রদর্শনী সব ইতিহাস দেখাতে না পারতেই পারে। কিন্তু ইতিহাসের দাবি হলো—যা বাদ পড়েছে, তার অস্তিত্বও স্বীকার করা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে তাই আরও উন্মুক্ত, দলিলনির্ভর ও বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করা দরকার। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, গবেষক ও নাগরিক সমাজ—সবার দায়িত্ব সেখানে আছে।
কারণ ইতিহাসের ছবির ফ্রেম যত বড় হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বোঝাপড়াও তত গভীর হবে। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—সেখানে শুধু বিজয়ের ছবি থাকে না, থাকে নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়ার সাহসও।