ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য যে সালিশি বা ‘আর্বিট্রেশন’ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের করা অনেক বাণিজ্যিক বিরোধের আবেদন বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকছে। কোনো কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত আদালত ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে বাণিজ্যিক বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যেই সালিশি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থাতেও যদি বছরের পর বছর সময় লাগে, তাহলে তা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
১১ বছরে প্রায় ৩,৮৪৪ সালিশি আবেদন
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হাইকোর্টে ৩ হাজার ৮৪৪টি সালিশি আবেদন করা হয়েছে। এসব আবেদনের সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা মূল্যমানের আনুমানিক এক হাজার আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। বিপরীতে বিপুলসংখ্যক আবেদন এখনো বিচারাধীন।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের শতাধিক নতুন আবেদন করা হয়েছে। তবে জুন পর্যন্ত এসব আবেদনের একটিরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। মাত্র কয়েকটি আবেদনে সালিশকারী নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ২৩৬টি আবেদনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র আটটির। ২০২৪ সালে ১৪৯টি আবেদনের মধ্যে ১৬টি এবং ২০২৩ সালে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ২৭৬টি আবেদনের মধ্যে মাত্র ছয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে সালিশি ব্যবস্থা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে সাধারণত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশি ধারা রাখা হয়। কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে অপর পক্ষ সালিশির নোটিশ দিয়ে সালিশি ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেয়।
সালিশকারী নিয়োগে কোনো পক্ষ ব্যর্থ হলে বা সহযোগিতা না করলে হাইকোর্ট প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারে। সালিশি ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথি ও প্রমাণ পর্যালোচনা করে বিরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়।
আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে বিদেশে কোনো সালিশি ট্রাইব্যুনাল রায় দিলে সেটি বাংলাদেশে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করতে হয়। ফলে মূল বিরোধ বিদেশে নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও বাংলাদেশে সেই রায় কার্যকর করতে গিয়ে নতুন করে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে।
একটি বিরোধেই কেটে গেছে প্রায় আট বছর
হংকংভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সাউথ এক্সপ্রেস লিমিটেডের ঘটনা দীর্ঘসূত্রতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
২০১৫ সালে চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং প্রতিষ্ঠান মদিনা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে একটি পুরোনো জাহাজ কেনার চুক্তি করে সাউথ এক্সপ্রেস। তবে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় সাউথ এক্সপ্রেস জাহাজটি অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিরোধটি যুক্তরাজ্যের সালিশি ট্রাইব্যুনালে গড়ায়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল সাউথ এক্সপ্রেসের পক্ষে রায় দিয়ে মদিনা এন্টারপ্রাইজকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
কিন্তু সেই রায় বাংলাদেশে কার্যকর করতে গিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। ২০১৮ সালে ঢাকা জেলা জজ আদালতে আবেদন করে সাউথ এক্সপ্রেস। প্রায় ছয় বছর শুনানির পর ২০২৪ সালে আদালত আবেদনটি খারিজ করেন।
এরপর সাউথ এক্সপ্রেস হাইকোর্টে আপিল করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে গত জুলাইয়ে জেলা জজ আদালতের রায় বাতিল করে যুক্তরাজ্যের সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকরের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
ফলে একটি বিরোধের নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের প্রক্রিয়াতেই প্রায় আট বছর কেটে গেছে। এখন বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ালে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আরও কত সময় লাগবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রায় পাওয়ার পরও অপেক্ষা
সালিশি ট্রাইব্যুনাল কোনো বিরোধের রায় দিলেই যে প্রক্রিয়া শেষ হয়, তা নয়। রায় কার্যকর করতেও অনেক ক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়।
ঢাকা জেলা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১৫০টি আবেদন এখনো ঝুলে আছে। এসব বিরোধের আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সালিশি ট্রাইব্যুনালে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পরও আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাওনা অর্থ বা ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে।
এক যুগ ধরে ঝুলে আছে মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানের বিরোধ
মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়া মেরিটাইম অ্যান্ড ড্রেজিং কর্পোরেশনের (এমএমডিসি) একটি বিরোধও এক দশকের বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন।
২০১১ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি হয়। দুই বছর পর বিরোধ তৈরি হলে সালিশি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেয় এমএমডিসি।
হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সালিশি বোর্ড ২০১৭ সালের আগস্টে এমএমডিসির পক্ষে রায় দেয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ২২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
তবে পরবর্তীতে ওই রায় বাতিলের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
সালিশকারী নিয়োগেই লেগেছে আট বছর
ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেড ও ইতালির টিএফজি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যকার বিরোধও সালিশি ব্যবস্থার ধীরগতির চিত্র তুলে ধরে।
২০১৬ সালে কার্বনেটেড পানীয় উৎপাদনের যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি হয়। পরবর্তীতে কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করায় বিরোধ তৈরি হয়।
চুক্তি অনুযায়ী পাওনা অর্থ ফেরত না পাওয়ায় ২০১৮ সালে হাইকোর্টে সালিশির আবেদন করে ট্রান্সকম। দীর্ঘ আট বছর পর চলতি বছরের মে মাসে হাইকোর্ট সালিশি বোর্ড গঠনের আদেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, আন্তর্জাতিক চর্চায় সাধারণত ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে সালিশি বোর্ড বিরোধ নিষ্পত্তি করে রায় দেওয়ার কথা। এরপর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে আদালতের পর্যায় পার হতে হয়।
বেঞ্চের স্বল্পতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সালিশি আবেদনের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হাইকোর্টে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের স্বল্পতা।
কোম্পানি ও সালিশি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মারগুব কবিরের মতে, সালিশি আবেদনের পাশাপাশি কোম্পানি, অ্যাডমিরালটি, ট্রেডমার্ক, ব্যাংক ও বিমা-সংক্রান্ত মামলাও একই বেঞ্চগুলোকে পরিচালনা করতে হয়।
ফলে মামলার চাপ বাড়ছে এবং সালিশি সংক্রান্ত আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, আদালতের সংখ্যা ও বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি সালিশি আইন সম্পর্কে বিচারক ও আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বৈদেশিক বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরীর মতে, মামলার ধরন যাই হোক না কেন, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে ব্যবসা করার সময় শুধু বাজারের সম্ভাবনা নয়, প্রয়োজন হলে আইনি সুরক্ষা ও বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির সক্ষমতাও বিবেচনা করেন। তাই সালিশি ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা দেশের বিনিয়োগ ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বাণিজ্যিক আদালত নিয়ে আশার কথা
সরকার অবশ্য বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দস কাজল বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিশি একটি কার্যকর পদ্ধতি। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশেষ বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সারাদেশে বাণিজ্যিক আদালত কার্যকর হলে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন আইন বা আদালত প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না। দ্রুত শুনানি, দক্ষ বিচারক ও আইনজীবী, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং রায় দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, বিনিয়োগকারীর কাছে একটি বিরোধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি শুধু আইনি সুবিধা নয়—এটি ব্যবসার নিরাপত্তা এবং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।