• হোম > অর্থনীতি > টিসিবির নতুন ব্যবসায়িক মডেল, লক্ষ্য ভর্তুকি শূন্য

টিসিবির নতুন ব্যবসায়িক মডেল, লক্ষ্য ভর্তুকি শূন্য

  • রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৩
  • ৮৩

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ভর্তুকি কমাতে টিসিবির ‘মিশন জিরো’

প্রতি বছর আড়াই থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ কমাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির পাশাপাশি এবার লাভজনক পণ্যের ব্যবসায়ও প্রবেশের পরিকল্পনা করছে।

নতুন পরিকল্পনার আওতায় সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, লবণ, আটা, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করার কথা ভাবছে টিসিবি। এসব পণ্য শুধু ফ্যামিলি কার্ডধারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করা হবে।

টিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়িক মডেল, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা গেলে সংস্থাটির ওপর সরকারের ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে ‘মিশন জিরো’ নামের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্য করার লক্ষ্য

টিসিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে শুরুতেই বছরে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ গত ১৪ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।

টিসিবি চেয়ারম্যানের ভাষ্য, ব্যবসার ধরন, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই ভর্তুকি অনেকাংশে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।

সাবান-ডিটারজেন্ট বিক্রি করে ২৮ কোটি টাকা লাভ

ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানোর অংশ হিসেবে গত এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি পণ্যের বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। সাবান, ডিটারজেন্ট, কাপড় পরিষ্কারের সাবান ও লবণ বিক্রি করে চার মাসে প্রায় ২৮ কোটি টাকা লাভ হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাজারদরের তুলনায় কম দামে লাক্স ও মেরিল সাবান, হুইল ডিটারজেন্ট পাউডার, চাকা ও হুইল সাবান বিক্রি করছে টিসিবি।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য কেনার কারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন দিতে হচ্ছে না। সাধারণ বিপণন ব্যবস্থায় উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কয়েকটি ধাপ থাকে। এসব ধাপের কমিশন পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

টিসিবির ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ব্যয় না থাকায় তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে ৬৫ টাকার লাক্স ও মেরিল সাবান ৪৫ টাকা, প্রতি কেজি ৮০ টাকার হুইল পাউডার ৬৫ টাকা এবং বাজারে ৪০ থেকে ৪২ টাকা দামের লবণ ৩৬ টাকায় বিক্রি করার উদাহরণ দিয়েছে টিসিবি।

ডিলারদের টাকা সরাসরি জমা, কমছে ঋণনির্ভরতা

টিসিবির ব্যবসায়িক সংস্কারের অন্যতম অংশ হিসেবে ডিলারদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আগে ডিলাররা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে টাকা জমা দিতেন। পরে সেই অর্থ টিসিবির হিসাবে পৌঁছাতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগত। এখন ডিলারদের সরাসরি টিসিবির ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে অর্থ পাওয়ার সময় কমে প্রায় সাত দিনে নেমে এসেছে।

টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, দ্রুত অর্থ হাতে আসায় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমেছে। গত দুই মাসে ডাল ও চিনি কেনার জন্য কোনো ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি। এতে সুদ ব্যয় কমেছে।

টিসিবির হিসাবে বর্তমানে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ অর্থ ছাড় হলে ব্যাংকঋণ ও সুদের ওপর নির্ভরতা আরও কমবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

নিজস্ব গুদাম ব্যবহারে কমেছে খরচ

পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছে টিসিবি। আগে জেলা প্রশাসনের আওতাধীন গুদাম ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা হলেও এখন সংস্থাটির নিজস্ব গুদাম থেকে ডিলারদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

টিসিবির দাবি, এ ব্যবস্থায় গুদাম ও পণ্য ওঠানামা বাবদ ব্যয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা কমেছে। একই সঙ্গে সরবরাহকারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করায় তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে পণ্যের গড় ক্রয়মূল্যও কমছে।

বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব

টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, নতুন পণ্যের ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা মুনাফা করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ভর্তুকির অর্থ সময়মতো ছাড় করলে আরও প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

এ ছাড়া ডিলারদের বিক্রির অর্থ সরাসরি টিসিবির হিসাবে জমা দেওয়ার ফলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা, নিজস্ব গুদাম থেকে সরাসরি ডিলারদের পণ্য সরবরাহে ২০ কোটি টাকা এবং টার্নওভার কর থেকে অব্যাহতি পাওয়া গেলে আরও ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখছে সংস্থাটি।

ভর্তুকির বড় অংশ যাচ্ছে পণ্যের দামে

টিসিবির তথ্য বলছে, সংস্থাটির মোট ভর্তুকির প্রায় ৭৩ শতাংশ তৈরি হয় ক্রয়মূল্যের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রি করার কারণে। ব্যাংকঋণের সুদ থেকে আসে ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় থেকে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়।

পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয় ভোজ্যতেলে। এরপর রয়েছে মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার পণ্য ৩ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় বিক্রি করেছিল টিসিবি। এতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়ে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা হয়। পরের অর্থবছরে তা কমে ২ হাজার ৭১৭ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও কমে ২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ ব্যয়ও টিসিবির জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৩০৯ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫৩৩ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৯৫ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

আরও যেসব সংস্কার আনতে চায় টিসিবি

ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি গুদাম ভাড়া ও অপ্রত্যাশিত ব্যয় কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং নিজস্ব গুদামের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে টিসিবির।

সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে তুলনামূলক কম সুদে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যের পণ্যের দাম প্রতি তিন মাস পরপর সমন্বয় এবং ডিলার কমিশন পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

টিসিবি পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) ব্যবস্থা, আধুনিক লজিস্টিকস, উন্নত গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও করছে। দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সঙ্গেও আলোচনা চলছে।

বর্তমানে পাঁচ পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি

বর্তমানে টিসিবি পাঁচটি প্রধান পণ্য—সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর—ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটি ২২ কোটি লিটার সয়াবিন তেল, ২ লাখ ২০ হাজার টন মসুর ডাল, ১ লাখ ১০ হাজার টন চিনি, ১৪ হাজার টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ টন খেজুর কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে।

এসব পণ্য ৬ হাজার ৪৩৮ জন ডিলারের মাধ্যমে প্রায় ৭২ লাখ ৫৪ হাজার সক্রিয় ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্যিক ব্যবসা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

টিসিবির নতুন ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, টিসিবির মূল দায়িত্ব যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তার মতে, বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলো টিসিবির সামাজিক সুরক্ষামূলক মূল কার্যক্রম থেকে আলাদাভাবে পরিচালনা করা উচিত।

তিনি আরও মনে করেন, টিসিবির পণ্য যেন কেউ কম দামে কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামানও টিসিবির উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সতর্ক যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তার মতে, সামাজিক সুরক্ষায় টিসিবির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভর্তুকির চাপ কমানোর বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক মডেলটি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের কতটা উপকার করবে, নাকি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য সুবিধা তৈরি করবে—সেটিও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।

সব মিলিয়ে, ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামলে টিসিবিকে আরও কার্যকর ও আর্থিকভাবে টেকসই প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই ‘মিশন জিরো’র মূল লক্ষ্য। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের সংস্থাটির মৌলিক দায়িত্ব অক্ষুণ্ন রাখা কতটা সম্ভব হয়, সেটিই হবে পরিকল্পনাটির বড় পরীক্ষা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14995 ,   Print Date & Time: Saturday, 3 October 2026, 06:04:41 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh