![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ড্রোন ঠেকাতে ৪০ কোটি ডলারের লেজার কিনছে যুক্তরাষ্ট্র
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় চালকবিহীন এসব উড়োজাহাজ মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে ড্রোন প্রতিরোধে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার সিস্টেম কিনতে অন্তত ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যারোভাইরনমেন্ট ইনকরপোরেটেডের কাছ থেকে কয়েক ডজন ‘লোকাস্ট’ লেজার সিস্টেম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন বাহিনীর।
ড্রোন প্রতিরোধে ‘ডিরেক্টেড এনার্জি’ প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে পেন্টাগনের জন্য এটি প্রথম বড় চুক্তি হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অ্যারোভাইরনমেন্টের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে চুক্তির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যায়। গত ২ জুলাইয়ের পর এক দিনে এটিই ছিল কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি।
কীভাবে কাজ করবে ‘লোকাস্ট’?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘লোকাস্ট’ সিস্টেমটি ছোট ও মাঝারি আকারের ড্রোন শনাক্ত করতে পারে। এরপর লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সেটিকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার রশ্মি নিক্ষেপের মাধ্যমে ধ্বংস করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণামূলক ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে উড়ন্ত একটি ড্রোন শনাক্ত করার পর সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির দিকে লক্ষ্য স্থির করে। এরপর শক্তিশালী লেজার রশ্মি নিক্ষেপ করা হলে ড্রোনটিতে আগুন ধরে যায় এবং সেটি ধ্বংস হয়ে যায় অথবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে পড়ে।
অপারেটররা স্ক্রিনে প্রদর্শিত তথ্য ও ভিডিও দেখে পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এমনকি ভিডিও গেমের কন্ট্রোলারের মতো দেখতে একটি যন্ত্রের মাধ্যমেও লেজারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।
কেন লেজার প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে পেন্টাগন?
ছোট ও মাঝারি আকারের ড্রোনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে হামলার প্রবণতাও বেড়েছে। এ কারণে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেখানে তুলনামূলক কম দামের ড্রোন মোকাবিলায় অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হয়েছে।
এই বাস্তবতায় কম খরচে বারবার ব্যবহার করা যায়—এমন প্রযুক্তির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে পেন্টাগন। লেজার সিস্টেমের ক্ষেত্রে প্রতিবার আলাদা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার পরিবর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলে একাধিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।
ফলে ভবিষ্যতে ড্রোনের বড় ঝাঁক মোকাবিলায় এ ধরনের ডিরেক্টেড-এনার্জি অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু প্রতিরোধ নয়, আক্রমণাত্মক ড্রোনেও জোর
ড্রোন প্রতিরোধের পাশাপাশি নিজেদের সামরিক ড্রোনের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত বছর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক ড্রোনের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর নির্দেশ দেন। আকাশে ড্রোনের সক্ষমতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রাখাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে প্রতিপক্ষের ড্রোন ধ্বংসের জন্য লেজারসহ নতুন প্রতিরোধ প্রযুক্তি তৈরি করছে, অন্যদিকে নিজস্ব ড্রোন বহরও দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
পরীক্ষায় ভুল করে মার্কিন ড্রোনই ভূপাতিত
তবে ‘লোকাস্ট’ সিস্টেম নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে মেক্সিকো সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পরীক্ষার সময় ভুলবশত মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনের একটি ড্রোনকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ভূপাতিত করে এই লেজার ব্যবস্থা।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়। দুর্ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) টেক্সাসের এল পাসো এলাকার আকাশসীমায় সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অত্যাধুনিক লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও বন্ধু-শত্রু শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নির্ভুলতার গুরুত্বও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ড্রোন যুদ্ধের দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোন মোকাবিলায় লেজার প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।