• হোম > রাজনীতি > শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরবেন, কী বলছে আইন ও রাজনীতি?

শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরবেন, কী বলছে আইন ও রাজনীতি?

  • শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৩
  • ৯৩

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ভারতের নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর তার দেশে ফেরার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি আদৌ বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কখন এবং কীভাবে ফিরবেন—আর দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কী হবে—এসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এবারই প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। বিষয়টি নিয়ে অতীতেও দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে ভারত এখন পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।

দেশে ফিরতে আইনি বাধা আছে কি?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা নিজে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি বাধা নেই। তবে দেশে প্রবেশের পর তাকে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল আইনি নয়, বরং এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ও গভীরভাবে জড়িত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং দুই দেশের সরকারের অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কী আছে?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। সাধারণভাবে যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়, সেগুলোর শাস্তি কমপক্ষে এক বছর কারাদণ্ডযোগ্য হতে হয়।

তবে চুক্তিতে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের কিছু সুযোগও রাখা হয়েছে। বিশেষ করে কোনো অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রকৃতির বলে বিবেচনা করা হলে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। অবশ্য হত্যা, গুম, সন্ত্রাসবাদ, বোমা বিস্ফোরণসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার বিধানও রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা রয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

২০১৬ সালের সংশোধনের পর প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটিও সহজ হয়েছে। কোনো মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে তার কপি দিয়েই সংশ্লিষ্ট দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন করতে পারে। এমনকি প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অস্থায়ী গ্রেপ্তারের অনুরোধও করা যায়।

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়টি এখন শুধু আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং দিল্লির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও জড়িত।

প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন একটি বিধান রয়েছে, যার আওতায় কোনো দেশের মনে হলে অভিযোগগুলো সরল বিশ্বাসে এবং ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে করা হয়নি, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন করলেও ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দেশে ফেরার ঘোষণা কি রাজনৈতিক কৌশল?

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা সময় উল্লেখ করেননি। এ কারণে তার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দেশে ফেরার ঘোষণা তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

আবার এই ঘোষণা বর্তমান সরকারকেও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখার একটি কৌশল হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।

তবে শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান কি না, নাকি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্য বিষয়টি সামনে এনেছেন—এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

দেশে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে ভ্রমণ অনুমতিপত্র বা ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে দেশে ফেরার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে সেটি দেওয়া হবে কি না, দিলেও কী শর্তে দেওয়া হবে—সেটিও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

আইনের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে রাজনীতি

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন আইন, রাজনীতি ও কূটনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তার নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছার ঘোষণা, অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের দাবি এবং ভারতের অবস্থান—এই তিনটি বিষয়ই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তিনি সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে ভারত কী অবস্থান নেবে এবং দেশে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর কী পরিণতি হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14959 ,   Print Date & Time: Saturday, 3 October 2026, 08:58:01 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh