![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চতুর্থ বছরে যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত ট্যাংক ও বিশাল সেনাবাহিনীর পাশাপাশি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমৃদ্ধ যুদ্ধ রোবট ও ড্রোন। জনবল সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের ঝুঁকি কমাতে মানবহীন স্থলযান (UGV) ব্যবহারে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের সামরিক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য অন্তত ৫০ হাজার মানবহীন স্থলযান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব রোবটের কিছুতে মেশিনগান, রাইফেল কিংবা রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চার সংযুক্ত রয়েছে। আবার কিছু রোবট গোলাবারুদ ও রসদ পরিবহন, আহত সেনাদের উদ্ধার কিংবা মাইন পেতে রাখার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
পূর্ব দনেৎস্কের দোব্রোপিলিয়া ফ্রন্টে সম্প্রতি এমনই একটি যুদ্ধ রোবট রুশ সেনাদের ওপর অভিযান চালায়। ইউক্রেনের ৯৩তম ব্রিগেডের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রোবটটি প্রথমে শুকনো ঘাসে আগুন লাগিয়ে শত্রু সেনাদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করে। এরপর ইউক্রেনীয় বাহিনী মেশিনগানের সহায়তায় অভিযান সম্পন্ন করে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ড্রোন নয়, মানবহীন স্থলযানও এখন প্রতিরক্ষার অপরিহার্য অংশ। তাঁর ভাষায়, সম্মুখসারিতে রসদ সরবরাহ, আহতদের উদ্ধার এবং সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনী সম্প্রতি সমুদ্রপথে চালকবিহীন নৌ-ড্রোনের মাধ্যমে একটি যুদ্ধ রোবট রুশ-নিয়ন্ত্রিত কিনবার্ন স্পিট এলাকায় পাঠিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। ‘উলি ৭.৬২’ নামের রোবটটি মেশিনগান থেকে গুলি চালিয়ে রুশ বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। মিশন শেষে নিরাপত্তার স্বার্থে রোবটটি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে দেয় বলে জানানো হয়েছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, মাত্র কয়েকজন অপারেটর দূর থেকে পুরো অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের মতে, সীমিত জনবল নিয়েও কার্যকর যুদ্ধ পরিচালনায় এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইউক্রেনের ‘আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সেস’-এর প্রধান রবার্ট ব্রোভডি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে বিপজ্জনক এলাকাগুলো এখন মূলত ড্রোন ও রোবটের নিয়ন্ত্রণে। তাঁর মতে, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে এবং সামরিক সক্ষমতাও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা ও অর্থনীতিতে রাশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে ইউক্রেন। একই সঙ্গে দেশটি যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে।
তবে রাশিয়াও পাল্টা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোন উন্নত করার পাশাপাশি ফাইবার-অপটিক নিয়ন্ত্রিত আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এদিকে ন্যাটোভুক্ত না হলেও ইউক্রেনের ড্রোন ও রোবটভিত্তিক যুদ্ধ কৌশল এখন পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে এবং যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
ইউক্রেনের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ রোবট কখনোই পুরোপুরি মানব সেনাদের বিকল্প নয়। বরং এসব প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো পদাতিক বাহিনীকে আরও নিরাপদ ও কার্যকরভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু ট্যাংক বা যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করবে না; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, যুদ্ধ রোবট এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিই সামরিক কৌশলের নতুন দিগন্ত নির্ধারণ করবে।