ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রাচীন মিসরে কেন এত পবিত্র ছিল বিড়াল? অবাক করা ইতিহাস জানুন
প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় বিড়াল ছিল শুধু একটি গৃহপালিত প্রাণী নয়, বরং ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার হাজার বছর আগে ফারাওদের আমল থেকেই বিড়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক অনন্য ঐতিহ্য, যার বহু নিদর্শন আজও ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে সংরক্ষিত রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মিসরীয়রা অসংখ্য বিড়ালকে মমি করে সংরক্ষণ করত। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পোষা প্রাণীর কবরস্থানও তৈরি করেছিল তারা, যেখানে সুন্দর অলংকার ও কলার পরিহিত বিড়ালের কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে।
গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখেছেন, পরিবারের প্রিয় বিড়াল মারা গেলে শোক প্রকাশের জন্য অনেক মিসরীয় নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন। এটি ছিল তাদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক।
ধর্মীয় বিশ্বাসে বিড়ালের বিশেষ মর্যাদা
গবেষকদের মতে, বিড়ালকে এত গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মিসরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস। ২০১৮ সালে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট-এর এক প্রদর্শনীতে উল্লেখ করা হয়, মিসরীয়রা দেবদেবী ও ফারাওদের চরিত্রে বিড়ালের দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখতেন।
তাদের বিশ্বাসে বিড়াল যেমন ছিল স্নেহশীল, বিশ্বস্ত ও পরিবারের রক্ষক, তেমনি ছিল স্বাধীনচেতা, সাহসী এবং প্রয়োজনে ভয়ংকর শিকারি।
এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায় গিজার মহাস্ফিংক্স, সিংহমুখী দেবী সেখমেত এবং বিড়ালের রূপধারী দেবী বাসতেত-এর ভাস্কর্য ও চিত্রকলায়। বিশেষ করে দেবী বাসতেতকে বিড়ালের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে পূজা করা হতো।
বাস্তব জীবনেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ধর্মীয় মর্যাদার পাশাপাশি বিড়াল ছিল কৃষিনির্ভর সমাজেরও অন্যতম সহায়ক। ইঁদুর, সাপসহ ক্ষতিকর প্রাণী শিকারে বিড়ালের দক্ষতা খাদ্যশস্য রক্ষা এবং মানুষের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এ কারণেই মিসরীয়দের ঘরে বিড়াল ছিল অত্যন্ত আদরের সদস্য।
ইতিহাসবিদরা জানান, অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নামও বিড়ালের নামে রাখত। উদাহরণ হিসেবে মেয়েদের জন্য ‘মিট’ নামটি জনপ্রিয় ছিল, যার অর্থই হলো বিড়াল।
ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল নির্মম বাস্তবতা
তবে এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ইতিহাসের আরেকটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৩০০ সালের মধ্যে দেবতাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে শিল্পপর্যায়ে বিড়াল প্রজনন করা হতো।
গবেষণায় উঠে এসেছে, লাখ লাখ বিড়ালছানাকে অল্প বয়সেই হত্যা করে তাদের মমি বানানো হতো এবং ধর্মীয় মানত বা উৎসর্গ হিসেবে সমাধিস্থ করা হতো।
আধুনিক এক্স-রে মাইক্রো-সিটি স্ক্যান প্রযুক্তিতে পরীক্ষা করা বেশ কয়েকটি বিড়ালের মমিতে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী বিড়ালছানার ঘাড় ভাঙার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ মেরি-অ্যান পলসওয়েগনার বলেন, দেবতাদের সন্তুষ্ট করা বা তাদের আশীর্বাদ লাভের আশায় সাধারণ মানুষ বিড়াল কিনে উৎসর্গ করতেন। এটি সে সময়ের একটি প্রচলিত ধর্মীয় রীতি ছিল।
প্রাচীন মিসরের ইতিহাস তাই দেখায়, বিড়ালের প্রতি অসীম ভালোবাসা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অন্ধ আচার—সবকিছু মিলিয়ে এক জটিল ও বিস্ময়কর ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, যা আজও বিশ্বের ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের আগ্রহের অন্যতম বিষয়।