![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জার্মানির বার্লিনে গত সপ্তাহে প্রাইড অনুষ্ঠানে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বপ্রাইড (WorldPride)-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী ক্যানাল প্যারেড। শনিবার শহরের খালপাড়জুড়ে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি সমানভাবে উচ্চারিত হয়েছে বৈচিত্র্য, সমঅধিকার এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বার্তা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অংশগ্রহণকারী, সমর্থক ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে আমস্টারডামের ঐতিহাসিক খালগুলো রূপ নেয় রঙিন এক মিলনমেলায়। রংধনু পতাকা, বেলুন, ব্যানার এবং বর্ণিল সাজে সজ্জিত অসংখ্য নৌযান ধীরগতিতে শহরের খাল অতিক্রম করে। খালের দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষ উচ্ছ্বাসে অংশ নেন এই আয়োজনের প্রতিটি মুহূর্তে।
এবারের বিশ্বপ্রাইডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল *”UNITY” (ঐক্য)*। নেদারল্যান্ডসজুড়ে দুই সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বৈচিত্র্য, মানবাধিকার এবং সমঅধিকারের বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২৫ বছর আগে বিশ্বের প্রথম আইনগতভাবে স্বীকৃত সমলিঙ্গের বিবাহ অনুষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহাসিক স্মরণে এবার বিশ্বপ্রাইডের আয়োজক শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে আমস্টারডাম।
### প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ ও বার্তার সমন্বয়
ক্যানাল প্যারেডে অংশ নেওয়া অনেকেই বিভিন্ন বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন। কারও হাতে ছিল *”Make America Gay Again”, আবার কারও ব্যানারে লেখা ছিল *”Same Love. Same Rights!”**। এসব স্লোগানের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে সম্মান, সমঅধিকার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরা হয়।
এছাড়া একটি নৌযানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদলে তৈরি দুটি বড় আকৃতির প্রতীকী মূর্তি প্রদর্শন করা হয়। ডাচ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত ওই মূর্তিগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যাতে তারা একে অপরকে চুম্বন করছে বলে মনে হয়। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে এটি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
### বার্লিন হামলার পর নজিরবিহীন নিরাপত্তা
গত সপ্তাহে বার্লিনে অনুষ্ঠিত প্রাইড অনুষ্ঠানে একটি ভ্যান জনতার মধ্যে ঢুকে পড়লে একজন নিহত এবং ৩০ জনের বেশি আহত হন। পরে জার্মান পুলিশ সন্দেহভাজন হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে। ওই ঘটনার পর থেকেই ইউরোপজুড়ে প্রাইড আয়োজনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আমস্টারডাম সিটি প্রশাসন অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যদিও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও শহরজুড়ে সাইকেলে টহলরত পুলিশ, খালে নৌপুলিশ, জেট স্কি, টহল নৌকা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আমস্টারডামের মেয়র ফেমকে হালসেমা জানান, বার্লিনের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও উৎসবের আনন্দ ও অংশগ্রহণকারীদের স্বাধীনতায় যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
### প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন, যিনি দেশটির প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। তাঁর উপস্থিতিকে অনেকেই বৈচিত্র্য ও সমঅধিকারের প্রতি সরকারের সমর্থনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
### “ভয় দেখিয়ে আমাদের থামানো যাবে না”
অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, বার্লিনের হামলা তাদের মনোবল দুর্বল করেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে।
৫৫ বছর বয়সী অংশগ্রহণকারী টিম কক্স বলেন, অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তা তাঁকে বিরক্ত করেনি। তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এমন নিরাপত্তার প্রয়োজন হওয়াটাই দুঃখজনক। তাঁর ভাষায়, প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাওয়া।
আমস্টারডাম প্রাইডের মুখপাত্র মার্টিন আলবার্স বলেন, সন্ত্রাসবাদের উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা। কিন্তু সেই ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করে সমাজকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
### “আরও জোরে নিজের পরিচয় প্রকাশ করব”
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং কয়েক বছর ধরে নেদারল্যান্ডসে বসবাসরত ৩২ বছর বয়সী ট্রে শন গ্রিফিন বলেন, বার্লিনের হামলা তাঁকে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আরও অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি বলেন, “যদি কেউ আমাকে ভয় দেখিয়ে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করতে চায়, তাহলে আমি আরও জোরালোভাবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করব।”
অন্যদিকে নৌযানে অংশ নেওয়া ২৫ বছর বয়সী জুলিয়ান ভ্যান ডার হেইডের মতে, বার্লিনের হামলা প্রমাণ করেছে যে আজও প্রাইডের মতো আয়োজনের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি।
### হামলার শিকারদের স্মরণ
বার্লিন হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে মঙ্গলবার আমস্টারডামের বিখ্যাত *হোমোমনুমেন্টে* (Homomonument) হাজারো মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। খালের ধারে অবস্থিত গোলাপি গ্রানাইটের ত্রিভুজাকৃতির এই স্মৃতিস্তম্ভটি সমকামী নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত।
ডাচ এইচআইভি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ক্যাসপার পিস্টার্স বলেন, বার্লিনের হামলার বিষয়টি সবার মনেই ছিল। তবে সহিংসতা কখনোই মানুষের পরিচয় বা অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে না। তাঁর মতে, যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন LGBTQ+ সম্প্রদায়ও থাকবে, আর কোনো ধরনের সহিংসতা বা ভয়ভীতি তা পরিবর্তন করতে পারবে না।
### ঐক্যের বার্তা
এবারের বিশ্বপ্রাইড শুধুমাত্র একটি উৎসব ছিল না; বরং এটি বৈচিত্র্য, মানবাধিকার, সমঅধিকার এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে। বার্লিনের মর্মান্তিক হামলার পরও লাখো মানুষের অংশগ্রহণ দেখিয়ে দিয়েছে যে ভয় ও সহিংসতার মধ্যেও স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং মানবাধিকারের দাবিতে মানুষের ঐক্য ও সংহতি অটুট রয়েছে।