• হোম > বাংলাদেশ | বাণিজ্য > বিদেশি বিনিয়োগের পথে আস্থা ফিরছে, আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু

বিদেশি বিনিয়োগের পথে আস্থা ফিরছে, আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু

  • শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৩
  • ১০৫

---

জাহিদুজ্জামান সাঈদ

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কেবল অর্থের প্রবাহ নয়; এটি একটি দেশের প্রতি বিশ্বের আস্থারও প্রকাশ। কোনো রাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করলে সেটি সাধারণত কয়েকটি বার্তা বহন করে—সেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল, অর্থনৈতিক নীতিতে ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ফলে কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক অংশীদারের ইতিবাচক মূল্যায়ন অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা ইতিবাচকভাবে সংশোধন করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দেবে যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত।

প্রশ্ন হলো, এই বক্তব্যের অর্থনৈতিক তাৎপর্য কতটা? এটি কি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য, নাকি এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত? উত্তর খুঁজতে হলে বিদেশি বিনিয়োগের বাস্তব চিত্র ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বোঝা প্রয়োজন।

আস্থা বিনিয়োগের প্রথম শর্ত:

বিদেশি বিনিয়োগকারী কোনো দেশে কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় নামার আগে কয়েকটি বিষয় মূল্যায়ন করেন। রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনবল এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় বিনিয়োগের পরিবেশ।

এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। কোনো দেশের নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মূল্যায়ন বিনিয়োগকারীদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি পরিবর্তনও সেই কারণেই কেবল পর্যটনের বিষয় নয়; এটি ব্যবসায়ী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, ইতিবাচক মূল্যায়ন বিনিয়োগের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগ নিশ্চিত করে না। বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে।

কেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা আলাদা গুরুত্ব বহন করে:

বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, কৃষি, ওষুধ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনী শিল্পে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান সেখানেই গড়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।

শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্জিও গর। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে সয়াবিন, তুলা ও গম সংরক্ষণের আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রস্তাবের ভেতরে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় এখনো সংরক্ষণ, পরিবহন ও গুদাম ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আধুনিক সংরক্ষণাগার গড়ে উঠলে খাদ্য অপচয় কমবে, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।

এটি কেবল কৃষিখাতের বিষয় নয়। আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা উন্নত হলে উৎপাদনশীল শিল্পও এর সুফল পাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন দেশেই বেশি আগ্রহী হন, যেখানে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য।

তথ্যপ্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত

বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষ দূত সার্জিও গর বলেছেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হতে পারে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রয়োজনীয় খনিজসম্পদের নিরাপদ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বিশ্ব অর্থনীতির নতুন প্রতিযোগিতা এখন প্রযুক্তিকে ঘিরে। যেসব দেশ দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নীতিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে থাকবে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তার এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সম্ভাবনা আর বাস্তবতা এক নয়। প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে গবেষণা, উদ্ভাবন, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্য নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও সমান মনোযোগ দিতে হবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক

এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14720 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 03:26:56 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh