• হোম > মতামত | রাজনীতি > গণতন্ত্রে কোনো সরকারই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়

গণতন্ত্রে কোনো সরকারই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়

  • শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৮:৫৩
  • ৫৬

---

বিশেষ প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকার সব সময়ই একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। এটি কোনো নিয়মিত রাজনৈতিক সরকারের বিকল্প নয়। বরং বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে নিরাপদ সেতুবন্ধনের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সাময়িক ব্যবস্থা। ফলে এ ধরনের সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও ভিন্ন হয়। মানুষ আশা করে, তারা হবে নিরপেক্ষ, সংযত এবং জবাবদিহিমূলক। কিন্তু প্রত্যাশা যত বড় হয়, প্রশ্নও তত বেশি ওঠে। তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একজন রাজনৈতিক সহকারী অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে রাজনীতির বাইরে সরিয়ে দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার পর বিএনপিকেও রাজনীতি থেকে সরিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য ক্ষেত্র তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। একই সময়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এ দুটি বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো অভিযোগই কেবল বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সত্য বা মিথ্যা হয়ে যায় না। অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ এবং আইনি যাচাইয়ের ওপর। এ কারণেই বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

গণতন্ত্রে কোনো সরকারই জবাবদিহিতার বাইরে নয়। সরকার নির্বাচিত হোক কিংবা অন্তর্বর্তী, রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকেই আসে। সেই ক্ষমতার ব্যবহারের হিসাবও জনগণকে দিতে হয়। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় নয়। বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক নীতি।

বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরকার পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ব্যয় কিংবা নীতিগত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোথাও সংসদীয় কমিটি কাজ করে, কোথাও বিচার বিভাগীয় কমিশন, আবার কোথাও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা। উদ্দেশ্য একটাই—সত্য উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ।

বাংলাদেশেও সেই নীতির ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক সময়ে গঠিত সরকারের ক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন আরও বেশি প্রয়োজন।

কেন প্রশ্ন উঠছে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সরকারি নিয়োগ, স্বাস্থ্য খাত, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারি ক্রয় এবং বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এসেছে। কোথাও ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ। কোথাও আবার দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

এসব অভিযোগের সবগুলো যে সত্য, এমন দাবি করা যায় না। আবার সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো স্বাধীন তদন্ত।

দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে যদি অভিযোগ জমা পড়ে থাকে, তবে সেগুলোর অনুসন্ধান দ্রুত শেষ হওয়া উচিত। দীর্ঘসূত্রতা কেবল সন্দেহ বাড়ায়। আর সন্দেহ দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বেশি ছড়ায় গুজব, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় অসংখ্য অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এসবের কিছু হয়তো বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি। আবার অনেক অভিযোগের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা তা নির্ধারণ করা। কারণ প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তদন্ত না করাও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মত দিয়েছেন, এসব সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের নীতি এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা উচিত।

এই মতামতকে কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বের বহু দেশে অন্তর্বর্তী বা কেয়ারটেকার সরকার সাধারণত দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা এবং অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সচরাচর সংযম প্রদর্শন করে।

বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। কোন সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিতে পারবে, আর কোনটি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দিতে হবে—এ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদি ভবিষ্যতে আবার কোনো নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করে, তাহলে বর্তমান অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে চারটি বিষয় এখনই স্পষ্ট করা জরুরি। প্রথমত, ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা। দ্বিতীয়ত, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক নিয়োগের নীতি। এবং চতুর্থত, কার্যকর জবাবদিহিতার কাঠামো। এগুলো স্পষ্ট থাকলে ভবিষ্যতের সরকারও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকবে।

তদন্তের দাবি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তদন্তের পদ্ধতিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তদন্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিশোধের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। আবার তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বাছাই করা বিচারও জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়।

সুতরাং তদন্ত হতে হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, আইনসম্মত এবং তথ্যভিত্তিক। তদন্ত সংস্থার ওপর কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকা চলবে না। অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানও সমানভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এটাই আইনের শাসনের প্রকৃত চর্চা।

গণতন্ত্রে জবাবদিহিতা কোনো সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতি। যে রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন কিংবা সাবেক—কেউই জবাবদিহিতার বাইরে থাকেন না, সেই রাষ্ট্রেই জনগণের আস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন তাই কেবল অতীতের হিসাব মেলানোর বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ।

অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে। তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট হবে। এই প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাসযোগ্য করে এবং নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়ায়।

বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যক্তি বা দলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সেই সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে—যদি আমরা সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে পারি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14670 ,   Print Date & Time: Tuesday, 15 September 2026, 07:17:30 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh