• হোম > বাণিজ্য > বিশ্ববাজার বাড়লেও কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি?

বিশ্ববাজার বাড়লেও কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি?

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ২০:৪৯
  • ৭৫

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বিশ্ব পোশাক শিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন করে প্রতিযোগিতার সংকেত দিচ্ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধীরগতির পেছনে শুধু গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ সমস্যা বা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নয়; বরং রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখনও বাংলাদেশকে কম দামে পোশাক উৎপাদনের দেশ হিসেবেই বিবেচনা করে। ফলে উচ্চমূল্যের, প্রযুক্তিনির্ভর ও মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের পরিবর্তে কম দামের অর্ডারই বেশি আসে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে।

‘বাংলাদেশ মানেই সস্তা’—এই ধারণা বদলানোর তাগিদ

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মূলত কম মূল্য সংযোজনের পোশাক উৎপাদন করেছে। এখন শিল্প উচ্চমূল্যের ও উদ্ভাবনী পণ্যের দিকে এগোতে চাইলেও আন্তর্জাতিক বাজারের একটি প্রচলিত ধারণা সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তার ভাষায়, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা মনে করেন বাংলাদেশ মানেই কম খরচে উৎপাদন। ফলে অন্য দেশের তুলনায় একই মানের পণ্যের জন্যও বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকদের কম দাম প্রস্তাব করা হয়। এতে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কারখানা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না।

শুধু দামে নয়, সক্ষমতার প্রতিযোগিতা এখন বাস্তবতা

বিশ্ব পোশাক শিল্পে প্রতিযোগিতার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে কম উৎপাদন ব্যয়ই ছিল প্রধান বিষয়, এখন সেখানে দ্রুত সরবরাহ, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ এখনও কম দামের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় প্রযুক্তিগত রূপান্তরে পিছিয়ে রয়েছে।

অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে সংকট

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু ক্রেতা এমন মূল্য প্রস্তাব দেন, যা বাস্তব উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোর অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত কম দামে অর্ডার আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

মহিউদ্দিন রুবেল উদাহরণ দিয়ে বলেন, কখনও কখনও একটি শীতকালীন জ্যাকেটের জন্য মাত্র ৫ ডলার মূল্য প্রস্তাব করা হয়, যা বাস্তবে মানসম্মত উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। এই ধরনের মূল্য প্রতিযোগিতা শিল্পের মুনাফা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতের সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

ব্র্যান্ডগুলোকেও বদলাতে হবে ক্রয়নীতি

বিশ্বজুড়ে টেকসই উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন নতুন নীতিমালা কার্যকর হচ্ছে। ফলে শুধু কারখানাগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে নয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নে অংশীদার হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, ভবিষ্যতের পোশাকশিল্পে শুধু কম দামের পণ্যের পরিবর্তে উন্নত মানের, পরিবেশবান্ধব ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্যের চাহিদাই বাড়বে।

দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও বড় বাধা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের নিজস্ব সীমাবদ্ধতাও কম নয়। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ঋণের জটিলতা, বন্দরজট, লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি শিল্পের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে।

এছাড়া এখনও অনেক কারখানায় ডিজিটাল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং তথ্যভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়নি।

ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তৈরি পোশাক কারখানার সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, রাসায়নিক ও আনুষঙ্গিক শিল্পে আরও বড় বিনিয়োগ জরুরি।

এতে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদনের সময় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলেও দেশের শিল্প তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বই হতে পারে সমাধান

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, দেশীয় প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে গবেষণা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশ শুধু বড় উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেই নয়, বরং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা আর শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদনের নয়; বরং গতি, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন এবং আস্থাভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14659 ,   Print Date & Time: Tuesday, 15 September 2026, 02:48:32 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh