• হোম > মতামত > অবিশ্বাস নয়, আস্থাই হোক সম্পর্কের ভিত্তি

অবিশ্বাস নয়, আস্থাই হোক সম্পর্কের ভিত্তি

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫:৩৭
  • ৬৯

---

বিশেষ প্রতিনিধি

কৃষকের জীবনের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—ভালো ফলনের জন্য শুধু পরিশ্রম নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা ও ধৈর্য। ধান কাটার মৌসুমে সফলতা আসে না; তার ভিত্তি তৈরি হয় অনেক আগেই। উন্নত বীজ নির্বাচন, জমির সঠিক পরিচর্যা এবং মাটির প্রতি যত্নশীল আচরণই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করে। আগাছায় ভরা জমি যেমন ভালো ফসল দেয় না, তেমনি অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাষ্ট্রের সম্পর্কও অনেকটা মানুষের সম্পর্কের মতো। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সময় লাগে। কখনো একটি প্রজন্ম, কখনো একাধিক প্রজন্মও লেগে যায়। কিন্তু একবার সেই বিশ্বাসে চিড় ধরলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে সন্দেহ ও অবিশ্বাস খুব দ্রুত জন্ম নেয় এবং ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ ভারত ও বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বর্তমানের সিদ্ধান্তই দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ভারতের পক্ষ থেকে শীর্ষপর্যায়ে যোগাযোগ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো দুই দেশের মধ্যে নতুন আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না, যখন অতীতের জটিলতা অতিক্রম করে নতুন অধ্যায় শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বর্তমান সময়টি হয়তো তেমনই একটি সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার চেয়ে পরস্পরকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা ও অনুমানের মধ্যেই বেশি আবদ্ধ ছিল। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন, নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে অনেক সময় গুজব প্রকৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

দুই দেশেই এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তি ও প্রবক্তা রয়েছে, যারা অতীতের ক্ষতকে টিকিয়ে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। ফলে নেতাদের প্রতিটি বৈঠককে কখনো আত্মসমর্পণ, কখনো গোপন সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলে সেটিকে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আবার সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকেও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন।

এভাবে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসই যেন দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে প্রচলিত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এমন ভাষা হয়তো ক্ষণস্থায়ী সংবাদ শিরোনাম তৈরি করতে পারে, একটি সুস্থ প্রতিবেশীসুলভ দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক নয়। গণিত বা ভূরাজনীতিতে সন্দেহ বাড়াতে পারে দূরত্ব, কিন্তু তা কখনো টেকসই নিরাপত্তা বা কল্যাণ বয়ে আনে না।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। এই স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। তাই অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির ওপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ভরশীল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

পক্ষান্তরে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বিশেষত্বও অনস্বীকার্য। অভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতা, অসংখ্য নদ-নদী, ভাষা-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতা, সাহিত্য এবং দীর্ঘ ইতিহাস দুই দেশকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। দেশভাগ বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করলেও স্মৃতি ও আত্মিক সম্পর্ক রয়ে গেছে অটুট। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে এই অঞ্চলের মানুষ বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, যদি এক পক্ষ সারাক্ষণ অতীতের অবদান স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্য পক্ষ কেবল অভিযোগের তালিকা সামনে ধরে রাখে। ইতিহাস আমাদের আত্মবিশ্বাস দেয়, কিন্তু চিরস্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো নিঃশর্ত দলিল নয়। অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের পথ দেখানোর জন্য, ভবিষ্যৎকে অতীতের বন্দিশালায় আটকে রাখার জন্য নয়।

বিশ্ব ইতিহাসে এমন পরিবর্তনের বহু উদাহরণ রয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যখন পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেন, তখন অনেকেই সেটিকে অবাস্তব মনে করেছিলেন। কিন্তু সেই সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়। একইভাবে দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজে পেয়েছিল। তারা অতীতকে অস্বীকার করেনি, তবে ভবিষ্যৎকে অতীতের হাতে জিম্মিও হতে দেয়নি।

এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, কেবল মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হওয়ার কারণে সম্পর্ক উন্নত হয়নি; বরং নেতারা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও আজ ঠিক তেমনি দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি সব বিষয়ে একমত হওয়ার মধ্যে নিহিত নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতার মধ্যেই তার আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে। এর অর্থ এই নয় যে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা থাকবে না। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য কিংবা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নানা চ্যালেঞ্জ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ভবিষ্যতেও পরীক্ষা করবে।

তবে একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয় সমস্যামুক্ত হওয়া নয়; বরং সমস্যা মোকাবেলায় তাদের প্রজ্ঞা, সংযম ও আত্মবিশ্বাসই প্রকৃত পরিচয় বহন করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব হলো ক্ষণিকের জনরোষ বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করা। যদি প্রতিটি সমঝোতাকে আত্মসমর্পণ এবং প্রতিটি সংলাপকে দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে কার্যকর কূটনীতির জন্য কোনো স্বাভাবিক পরিসরই অবশিষ্ট থাকবে না।

পরিশেষে,আজ ভারত ও বাংলাদেশের সামনে কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল সুযোগ উপস্থিত। এটি শুধু অতীতকে নতুনভাবে মূল্যায়নের নয়, বরং ভবিষ্যতের একটি নতুন অধ্যায় যৌথভাবে রচনারও সুযোগ। এর জন্য অতিরিক্ত আবেগ বা আত্মসংশয়ের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিজ নিজ সার্বভৌমত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থা, গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রতি বিশ্বাস এবং এই উপলব্ধি যে, দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেও ভিন্ন অবস্থান থেকে সহযোগিতার সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

বাংলার কৃষক জানেন, ফসল ঘরে তোলার অনেক আগেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বীজ বপনের সঠিক মুহূর্তে। আজ ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ যে আস্থার বীজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সম্পর্ক তারই সুমিষ্ট ফল বহন করবে। কারণ প্রাচীন প্রবাদটি আজও সমান সত্য ও প্রাসঙ্গিক—যেমন বুনবে, তেমনই ফল পাবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14638 ,   Print Date & Time: Monday, 14 September 2026, 05:52:42 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh