![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের প্রধান শিল্পখাতগুলো ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে। উৎপাদন ধরে রাখতে অনেক কারখানা মালিক বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে বাজারদরের চেয়ে প্রতি লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা এখন স্বাভাবিক সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
আশুলিয়ার এক রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার মালিক জানান, কয়েক বছর ধরে গ্যাসের সংকটে ভুগলেও এখন বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে ফিলিং স্টেশন থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং কারখানা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি বড় স্পিনিং মিলের মালিক জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের কারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ। আগে যেখানে দৈনিক গ্যাস বিল ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা, এখন শুধুমাত্র ডিজেল কিনতেই প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শিল্প মালিকদের ভাষ্য, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ গ্যাসনির্ভর শিল্প কারখানা মাত্র ২০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এক মাস আগেও এই হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলোতে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং উৎপাদনকে আরও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানিয়েছে, চলমান সংকট দেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ইতোমধ্যে কিছু রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে এসব ক্রেতাকে আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। ইউরোপের কয়েকজন ক্রেতাও গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শুধু টেক্সটাইল খাত নয়, সিরামিক, চামড়া, ইস্পাত ও ওষুধ শিল্পেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, গ্যাস সরবরাহের অভাবে ৭০টি সদস্য কারখানার মধ্যে অন্তত ২৫টি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংক ঋণ, শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
একই চিত্র ইস্পাত শিল্পেও। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ছোট কারখানাগুলোর অনেকগুলোতেই গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় মেশিন পুনরায় চালু করতেও অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে।
ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে এপিআই উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ছে, কারণ এসব উৎপাদন লাইনে মেশিন দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা যায় না।
এদিকে সরকার আশা প্রকাশ করেছে, আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি শুরু হবে। তবে শিল্প মালিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এবং মহেশখালীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ থাকলেও এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, একটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপন ও চালু করতে সাধারণত সরকারি ঘোষণার তুলনায় বেশি সময় প্রয়োজন হয়। তাই বিকল্প গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট পুরোপুরি দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।