![]()
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
প্রেক্ষাপট
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব, গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংগঠনটির বিতর্কিত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়ে ৩০ জুলাই শুনানির আয়োজন করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, রিহ্যাবের সহ-সভাপতি-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে সংগঠনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১২টি অভিযোগের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক বিরোধ নয়—এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা কাঠামো কতটা কার্যকর, তা যাচাইয়ের একটি সুযোগও তৈরি করেছে।
১২ দফা অভিযোগের সারসংক্ষেপ
অভিযোগগুলোকে বিষয়ভিত্তিকভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করে দেখা যায়—আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া সংক্রান্ত এবং পরিচালকদের প্রতি আচরণ সংক্রান্ত।
১। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া প্রায় ২ কোটি টাকা উত্তোলন ও ব্যয়।
২। অতিরিক্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকার ব্যয়ের হিসাব বোর্ডে উপস্থাপন না করা।
৩। স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনে গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করা।
৪। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতিতে অনিয়ম।
৫। গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগ।
৬। ক্রয়সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি বিলুপ্ত করা।
৭। সরকারি পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আপত্তি।
৮। পরিচালকদের সঙ্গে অসদাচরণ।
৯। মেম্বারশিপ ডেভেলপমেন্ট কমিটিতে পরিচালকদের বাদ দেওয়া।
১০। সিনিয়র সহ-সভাপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব অর্পণে অনিয়ম।
১১। বোর্ড সভা আহ্বান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করা।
১২। এজিএম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ১২টি অভিযোগের অধিকাংশই মূলত একটি অভিন্ন সমস্যার বিভিন্ন প্রকাশ—সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বোর্ডের সমষ্টিগত ভূমিকা খর্ব হয়ে একক বা সংকীর্ণ পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত হওয়া। আর্থিক ব্যয়, কমিটি গঠন, নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগের মূল সুর একই: পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া ও বোর্ডের অনুমোদন উপেক্ষিত হয়েছে।
নতুন প্রশ্ন: কৃষিবিদ সিকিউরিটির কার্যাদেশ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত
মূল ১২ দফা অভিযোগের বাইরে আরেকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে, যা সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাপ্ত কার্যাদেশ অনুযায়ী, ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে রিহ্যাব কার্যালয়ের নিরাপত্তা সেবা প্রদানের জন্য কৃষিবিদ সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (KSSL)-কে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
চুক্তির শর্তাবলি:
১। ২ জন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ।
২। জনপ্রতি মাসিক সেবামূল্য ২০,০০০ টাকা (ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যতীত)।
৩। চুক্তির মেয়াদ ১৬ জুন ২০২৬ থেকে ১৫ জুন ২০২৭।
অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, রিহ্যাবের বর্তমান সভাপতি একই সঙ্গে কৃষিবিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান, এবং KSSL কৃষিবিদ গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সভাপতির নেতৃত্বাধীন সংগঠন থেকে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে সেবা কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে—যা রিলেটেড-পার্টি ট্রানজ্যাকশন বা সংশ্লিষ্ট-পক্ষীয় লেনদেনের একটি সাধারণ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।
করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতির আলোকে বিশ্লেষণ
সংশ্লিষ্ট-পক্ষীয় লেনদেন নিজে থেকেই অবৈধ বা অনৈতিক নয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করপোরেট গভর্ন্যান্স চর্চায় এ ধরনের লেনদেনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় না, বরং কয়েকটি সুরক্ষামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করে তা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোর নিরিখে
এই কার্যাদেশ পর্যালোচনা করলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে:
প্রকাশ ও স্বচ্ছতা (Disclosure): সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থ বোর্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল কি না, এবং তা সভার কার্যবিবরণীতে (মিনিটসে) নথিভুক্ত আছে কি না।
ভোটদান থেকে বিরত থাকা (Recusal): সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট পরিচালক বা সভাপতি আলোচনা ও ভোটদান থেকে সরে ছিলেন কি না।
স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া (Arm’s-Length Principle): উন্মুক্ত দরপত্র বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তুলনামূলক মূল্যায়ন হয়েছিল কি না, নাকি সরাসরি একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য (Fair Value): নির্ধারিত সেবামূল্য তুলনীয় বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, অর্থাৎ সংশ্লিষ্টতার কারণে সংগঠন কোনো বাড়তি ব্যয় বহন করছে কি না।
গঠনতান্ত্রিক ও আইনি ভিত্তি (Compliance): সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য আইনে সংশ্লিষ্ট-পক্ষীয় লেনদেন অনুমোদনের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বেঁধে দেওয়া থাকলে তা অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্ব (Fiduciary Duty): বোর্ডের সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন কি না, তা যাচাইযোগ্য নথির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় কি না।
এই মানদণ্ডগুলোর প্রতিটির উত্তর এখনও প্রকাশ্যে জানা যায়নি। ফলে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে নিশ্চিতভাবে অনিয়ম বলা যায় না, আবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক লেনদেন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
করপোরেট গভর্ন্যান্সের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট-পক্ষীয় লেনদেনে প্রমাণের দায়ভার (burden of proof) সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপরই বর্তায়—অর্থাৎ লেনদেনটি যে ন্যায্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তা দেখানোর দায়িত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর, অভিযোগকারীর নয়। এই মানদণ্ডে বিচার করলে রিহ্যাব কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নথি সক্রিয়ভাবে প্রকাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর জবাব হতে পারত।
সভাপতির বক্তব্য
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদনক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান কমিটি মাত্র তিন মাসে পূর্ববর্তী কমিটির তুলনায় বেশি কাজ করেছে। তাঁর মতে, এসব অভিযোগ সংগঠনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের অবস্থান
অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক ব্যয়, কমিটি গঠন, কর্মকর্তা নিয়োগ, কার্যাদেশ প্রদান এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয়নি। তাঁদের মতে, বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর না রাখাই সংগঠনের স্বার্থে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র এবং তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পর্যবেক্ষণ
বর্তমানে রিহ্যাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শুনানি এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সভাপতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা সেবার কার্যাদেশ প্রদান করপোরেট গভর্ন্যান্স ও স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
এই মামলার চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—বোর্ডের যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না, গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না, এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেন স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে কি না। যতক্ষণ না এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর প্রকাশ্যে আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি অভিযোগ ও পাল্টা-বক্তব্যের পর্যায়েই থাকবে।