ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের হামলার চেষ্টার জবাবে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের “শক্তিশালী জবাব”।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেই ঘটনার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। তবে পাঁচ মাস পার হলেও যুদ্ধ থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
কয়েক দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর আবারও সামরিক সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। এর আগে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার কারণে উভয় পক্ষ কিছুদিন হামলা বন্ধ রেখেছিল। ট্রাম্প সেই আলোচনা “খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ” বলে উল্লেখ করলেও ইরান নতুন করে কোনো আলোচনা চলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
হামলার ঘোষণা দেওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলার চেষ্টার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এবার পাল্টা আঘাত হানার সময় এসেছে এবং প্রয়োজন হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের জবাবে তারা জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, সতর্কতা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করায় তাদের নৌবাহিনী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এই জলপথ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার টানা ১৩ দিনের বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ইরানের সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্য করেই সেই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সূত্রে বহু হতাহতের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসির নির্দেশনায় পরিচালিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বাহিনী পূর্ব ইরাকে একাধিক অস্ত্র গুদাম, লজিস্টিক কেন্দ্র এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) দাবি করেছে, ওই হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্সি এই হামলার নিন্দা জানিয়ে একে দেশটির সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরাক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ দ্রুত উন্মুক্ত না হলে এই সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।