![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনা যেভাবে সামনে এসেছে, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেওয়ার মতো। ভাইরাল হওয়া এসব ভিডিওতে নারীর ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের চিত্র কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর এক গভীর পচনশীলতার লক্ষণ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার একটি বড় অংশই ঘটছে নারীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত পরিবারে। আবার একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্র, জনসমাগমস্থল কিংবা ভার্চুয়াল জগতেও নারীরা যে নিরাপদ নন, তা আজ প্রমাণিত সত্য।
একসময় আমাদের সমাজে ধারণা করা হতো, নারী নির্যাতন মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা শিক্ষার অভাবের ফল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। শিক্ষিত, বিত্তবান ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার জোরে এসব ঘটনা অনেক সময় আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনায় দেখা গেল, পোশাকশিল্পের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নিজের শিশু সন্তানের সামনেই তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে মারধর করছেন। দীর্ঘ ১৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে ওই নারী প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ দেওয়ার পরও তাকে লাগাতার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিন সন্তানের জনক একজন শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষের এমন আচরণ কেবল পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ রূপকেই উন্মোচন করে না, বরং আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ভয়াবহ ধসকেও সামনে নিয়ে আসে।
এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। কিছুদিন আগেই এক মডেল ও অভিনেত্রী বিজ্ঞাপনের চুক্তির কথা বলে ডেকে নিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। প্রভাবশালী মহলের ভয় দেখিয়ে এবং শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগী নারী প্রথমে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি। এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নারীরা আজ ঘরে যেমন নিরাপদ নন, তেমনি কর্মক্ষেত্র বা জনসমাগমেও নিরাপত্তার লেশমাত্র পাচ্ছেন না।
নারীর প্রতি সহিংসতার বাস্তব চিত্র কতটা গভীরে প্রোথিত, তার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৮৭ শতাংশেরও বেশি নারী স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে একটি বিরাট অংশ মানসিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার।
তবে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। কারণ পারিবারিক সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা সমাজের ভয়ে চার দেয়ালের মধ্যেই চাপা পড়ে থাকে। সামাজিক চাপ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং লোকলজ্জার ভয়ে নারীরা মুখ খোলেন না। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিতে বহু পরিবারে নেমে আসে অশান্তি, অনেকে বাধ্য হন বিবাহবিচ্ছেদের পথ বেছে নিতে, কিংবা চরম হতাশা থেকে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেন।
অপরাধের নেপথ্য কারণ ও সামাজিক অস্থিরতা
নারীর প্রতি এই সহিংসতার পেছনে কাজ করছে বহুমুখী সংকট। অতিরিক্ত অর্থের লোভ, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব সমাজকে গ্রাস করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব এবং নারীবিদ্বেষী মানসিকতা।
পরিবার হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একক। রাষ্ট্রে ও সমাজে যখন অস্থিরতা ও অপরাধের বিস্তার ঘটে, তার নেতিবাচক প্রতিফলন অনিবার্যভাবে পরিবারেও পড়ে। বর্তমান সময়ে গ্যাং কালচার, মাদকের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে নারীদের ব্ল্যাকমেইল করার নতুন অপসংস্কৃতি অনলাইন জগতেও নারীদের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।
নারীর সুরক্ষায় আমাদের দেশে আইনি কাঠামো যে একেবারেই নেই, তা নয়। ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ এবং সহায়তা হিসেবে ১০৯ হেল্পলাইন চালু রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেই যে সমস্যার সমাধান হয় না, বর্তমান পরিস্থিতি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। মাঠপর্যায়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে।
অনেক নারী আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে কেবল সংসার টিকিয়ে রাখতে বা নির্যাতন বন্ধ হওয়ার আশায় দিন কাটান। তাই শুধু আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক উদ্যোগ, ওয়ার্ডভিত্তিক নারী নেতৃত্ব বিকাশ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
করণীয় কী?
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক মানসিকতার আমূল পরিবর্তন।
১. পরিবার থেকেই পুত্রসন্তানকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সমতার শিক্ষা দিতে হবে।
২. নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও প্রসারিত করতে হবে।
৩. অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমে নারীর মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে এবং অপসংস্কৃতি রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে, একজন নারী যখন ঘরে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নির্যাতিত হন, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির সংকট থাকে না; এটি পুরো সমাজের মানবিকতার প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। নারীর নিরাপত্তা মানে কেবল নির্দিষ্ট কোনো লিংগের অধিকার রক্ষা নয়; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। আর কতকাল নারীদের এই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমাজকে আর নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকলে চলবে না। এখনই সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়।