![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; সেগুলো রাষ্ট্রের চরিত্র, প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে। এমন সময়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—পরিবর্তন কি কেবল নেতৃত্বের, নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থারও? কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় সেই আন্দোলন কতটা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ নিতে পারে, তার ওপর।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে জুলাই সনদ। এই দলিলকে অনেকেই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যদের কাছে এটি এখনো একটি অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—জুলাই সনদ কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি হতে পারবে, নাকি এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিভাজনের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠবে?
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি নতুন নয়। গত দুই দশকে প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক সংকটের পরই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা, সংসদের কার্যকারিতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, নির্বাচনব্যবস্থাকে অধিক গ্রহণযোগ্য করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো প্রস্তাবগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক দাবি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ, গবেষক, আইনজ্ঞ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আলোচনার বিষয়। অর্থাৎ জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অনেক প্রস্তাবের মধ্যে নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার মধ্যেই নিহিত। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যখন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে, তখন কেন সেই সংস্কারের দলিলটিই বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠছে?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের আগে রাজনৈতিক সংলাপের বিকল্প নেই। কিন্তু সংলাপ এবং সর্বসম্মত জাতীয় ঐকমত্য এক জিনিস নয়। জুলাই সনদের মধ্যেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদ রয়ে গেছে। অর্থাৎ দলিলটি নিজেই স্বীকার করছে যে এটি সব প্রশ্নে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।
এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চিত্র। একটি বহুদলীয় সমাজে সব প্রশ্নে শতভাগ ঐকমত্য তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মতভেদের মধ্যেও আলোচনার পথ খোলা রাখা।
এই কারণেই জুলাই সনদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল বলা যেতে পারে; কিন্তু একে প্রশ্নাতীত জাতীয় চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গণভোট সব সমস্যার সমাধান নয়:
জুলাই সনদ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো গণভোট।
কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে, জনগণের গণভোটে অনুমোদন পেলেই সনদের সব প্রস্তাব চূড়ান্ত বৈধতা পাবে এবং ভবিষ্যতের সরকারও সেই কাঠামোর বাইরে যেতে পারবে না।
এই ব্যাখ্যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অতিমাত্রায় সরলীকরণ করে। গণভোট জনগণের মতামত যাচাইয়ের একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণভোট কখনো সংসদীয় বিতর্ক, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, বিচারিক পর্যালোচনা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প হতে পারে না। বিশ্বের বহু দেশে গণভোট হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গণভোট রাজনৈতিক বৈধতা দিলেও তার বাস্তবায়নের জন্য আইনসভা, আদালত এবং রাজনৈতিক সমঝোতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই।
ভিন্নমত কি সংস্কারবিরোধিতা?
জুলাই সনদকে ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা সম্ভবত অন্য জায়গায়।
কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল সনদের নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব কিংবা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেক সময় তাকে জুলাই আন্দোলনের চেতনার বিরোধী কিংবা সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণই হলো যুক্তিনির্ভর মতপার্থক্য। কেউ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে থেকেও কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কেউ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমর্থন করেও সাংবিধানিক কাঠামোর কোনো ধারা নিয়ে ভিন্নমত দিতে পারেন। আবার কেউ নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন চান, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। এসবই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বরং প্রশ্নহীন সমর্থনের সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; দুর্বল করে।
ইতিহাস কী বলে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সংবিধান এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সংলাপ, আপস, মতভেদ এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে তা গড়ে উঠেছিল। স্পেনে স্বৈরশাসনের অবসানের পর গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেউ একক বিজয়ী হতে পারে না।
চিলি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সংবিধান তৈরির চেষ্টা করেছিল। প্রথম খসড়া গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর আবার নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থাৎ জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নতুনভাবে এগিয়েছে।
এই উদাহরণগুলোর একটি অভিন্ন শিক্ষা রয়েছে—টেকসই সাংবিধানিক সংস্কার কখনো একক রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং দীর্ঘ আলোচনার ওপর দাঁড়ায়।
জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি একটি জাতীয় সংস্কার কাঠামো হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও এখানেই। যদি কোনো রাজনৈতিক দল এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অনাস্থা তৈরি হবে। তখন রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা ধীরে ধীরে নীতিগত বিতর্ক থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হবে। বিশেষ করে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে সনদের কোনো অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতা, তাহলে সংলাপের পরিবেশ নষ্ট হবে।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং কোনো নির্দিষ্ট দলিলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এক জিনিস নয়।
সরকারের দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ
এই বাস্তবতায় সরকারের দায়িত্বও কম নয়।সরকারের উচিত হবে জুলাই সনদকে এমনভাবে উপস্থাপন না করা, যেন এটি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের প্রশ্নাতীত ঐকমত্যের প্রতিফলন। বরং স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—এটি একটি চলমান রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি, যেখানে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, আবার কিছু বিষয়ে মতভেদও রয়েছে। মতভেদকে স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।
জুলাইয়ের চেতনার প্রকৃত অর্থ:
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের প্রত্যাশা কেবল সরকার পরিবর্তন ছিল না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা দলের নয়, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য আন্দোলন করেননি। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে জুলাই সনদকে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বিজয়ের স্মারক নয়, বরং জাতীয় পুনর্গঠনের যৌথ ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
ঐকমত্যের পথই টেকসই পথ:
রাষ্ট্র সংস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে স্থায়ী দলিলগুলো সেগুলোই, যেগুলো ভিন্নমতকে দমন করে নয়, বরং ধারণ করে এগিয়েছে। জুলাই সনদও সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন তিনটি বিষয়—অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই নয় যে সবাই একই কথা বলবে; বরং এই যে সবাই নিজের কথা বলার সুযোগ পাবে এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জুলাই সনদের প্রকৃত শক্তিও এখানেই। এটি যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র না হয়ে জাতীয় সংলাপের মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক করার পথে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, যদি এটিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মানদণ্ড বা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কৌশলে রূপ দেওয়া হয়, তাহলে যে দলিল জাতীয় ঐক্যের আশা জাগিয়েছে, সেটিই অনিচ্ছাকৃতভাবে নতুন রাজনৈতিক বিভাজনের উৎস হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এর ভাষা নয়, এর রাজনৈতিক ব্যবহার। দলিলের চেয়ে বড় হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতি যদি সংলাপ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়ায়, তবেই জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক নথি হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের এক স্থায়ী মাইলফলক।