![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরানকে ঘিরে কয়েক মাসের সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে ‘ভালো আলোচনা’ চলছে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করবে বলেও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার এক বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষায়, আলোচনা সফল হলে সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।
পরে মিশিগানে এক নির্বাচনী সমাবেশে ইরান প্রসঙ্গে আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরানকে ঘুষ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তাদের পরাজিত করতে হবে এবং আমরা সেটিই করব। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটি সময়ই বলে দেবে। এই মুহূর্তে আলোচনা ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে।’
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এখনো দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে এবং তেহরান কূটনৈতিক পথ থেকে সরে যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরান নিজে থেকে অনুরোধ জানিয়েছে—এমন দাবি তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন।
রয়টার্সকে দেওয়া এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা পর্যন্ত ইরানও নিজেদের সামরিক হামলা স্থগিত রাখবে। তবে একই সময়ে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক জলসীমায় জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলেছে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একটি ‘অবৈধ সামুদ্রিক অবরোধ’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা একাধিক ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে। দেশটির অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এসব ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনার জবাব দেওয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করছে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, সৌদি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের তেল পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান আবারও দাবি করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখনো তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অবাধ রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো কাটেনি।
এদিকে সংঘাত প্রশমনের ইঙ্গিত পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সামরিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমার সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরান নীতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ নতুন করে যুদ্ধ সম্প্রসারণের পক্ষে নয়। একই সঙ্গে অনেকের মত, সংঘাতের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সামরিক পরিস্থিতিই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।