![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস যৌথভাবে ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের আশ্রয়প্রার্থীদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে ইইউর বাইরের একটি তৃতীয় দেশে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সম্ভাব্য রিটার্ন হাব স্থাপনের জন্য কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
এই উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন রিটার্ন রেগুলেশন থেকে। প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইইউর বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপন করতে পারবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েই পাঁচটি দেশ সম্ভাব্য হোস্ট দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই পরিকল্পনা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; বরং যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে, সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য হতে পারে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার দীর্ঘদিন ধরেই খুব কম। বর্তমানে প্রথম ধাপেই মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ আবেদন অনুমোদন পায়। নতুন রিটার্ন নীতি কার্যকর হলে আশ্রয় আবেদন আগের তুলনায় দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে এবং প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও আরও ত্বরান্বিত হবে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (EUAA) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছরে বাংলাদেশিদের মোট ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। তবে প্রথম ধাপে স্বীকৃতি পেয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ আবেদন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন কম গ্রহণযোগ্য হওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন রিটার্ন নীতি কার্যকর হলে অনেক আবেদনকারী আরও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের ইইউর বাইরে স্থানান্তর করলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিচারিক প্রতিকার এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনারও আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন ও নন-রিফাউলমেন্ট নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, রিটার্ন হাব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তিনি বৈধ অভিবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, অনিয়মিতভাবে বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।
এদিকে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর উদ্যোগ মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এ ধরনের নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা, আইনি জটিলতা ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় কমিশনের নতুন রিটার্ন নীতি এবং পাঁচ দেশের রিটার্ন হাব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসনের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।