• হোম > অর্থনীতি > রাজনৈতিক লাইসেন্সের কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ, জানেন কেন?

রাজনৈতিক লাইসেন্সের কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ, জানেন কেন?

  • সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৫:১৪
  • ৫৮

---

আহমেদ তোফায়েল

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা চলছে। কখনো আলোচনার কেন্দ্রে থাকে খেলাপি ঋণ, কখনো মূলধন ঘাটতি, আবার কখনো তারল্য সংকট। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর গভীরে গেলে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—সমস্যার শুরু কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সেই প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া চতুর্থ প্রজন্মের কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার এখন দেশের সর্বোচ্চ। এটি বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং করপোরেট সুশাসনের সীমাবদ্ধতার একটি প্রতিফলন।

একটি ব্যাংকের জন্ম হয় মানুষের সঞ্চয়কে নিরাপদ রেখে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য। কিন্তু যখন ব্যাংকের লাইসেন্স অর্থনৈতিক প্রয়োজনের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সেই দুর্বলতা খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং আস্থাহীনতার মাধ্যমে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিসংখ্যান বলছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত নয়টি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৫২ শতাংশেরও বেশি এখন খেলাপি। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে ৫২ টাকার বেশি আদায় হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ, সেখানে এই শ্রেণির ব্যাংকগুলোর অবস্থান আরও উদ্বেগজনক।

এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। এমন একটি অবস্থায় ব্যাংক কার্যত ব্যবসা করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কারণ ব্যাংকের মূল সম্পদই হলো তার ঋণ। সেই সম্পদের বড় অংশ যদি আদায়যোগ্য না থাকে, তাহলে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, মুনাফা কমে, মূলধন ক্ষয় হয় এবং শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের আস্থাও দুর্বল হতে থাকে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয় কঠোর আর্থিক, প্রযুক্তিগত এবং পরিচালনাগত সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশেও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু অতীতে এমন অভিযোগ বারবার উঠেছে যে, বাজারের বাস্তব চাহিদা কিংবা আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এর ফল কী হয়েছে, আজ তার বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেসব ব্যাংকের করপোরেট সুশাসন দুর্বল ছিল, যেসব প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ছিল, যেখানে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেখানেই খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনা যদি পেশাদার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও দুর্বল হয়ে যায়। ঋণ মূল্যায়নের জায়গায় সম্পর্ক গুরুত্ব পায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্যার চক্র।

খেলাপি ঋণকে অনেক সময় শুধুই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত।

যখন একটি ব্যাংকের বিপুল অর্থ আটকে যায়, তখন নতুন উদ্যোক্তা ঋণ পান না। শিল্পে বিনিয়োগ কমে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থসংকটে পড়েন। ব্যাংক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সুদের হার বাড়ানোর চাপ অনুভব করে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সহায়তার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, কয়েকজন বড় ঋণখেলাপির দায় শেষ পর্যন্ত বহন করেন সাধারণ আমানতকারী, নিয়মিত ঋণগ্রহীতা এবং পুরো অর্থনীতি।

খেলাপি ঋণ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে দেশের সামগ্রিক আর্থিক ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন এবং বিশেষ নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঋণ নিয়মিত আদায় না হলেও কাগজে-কলমে সেটিকে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। এতে সাময়িকভাবে পরিসংখ্যান ভালো দেখালেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং প্রকৃত ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং তুলনামূলক কঠোর হিসাবায়নের কারণে খেলাপি ঋণের হার হঠাৎ বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি নতুন সমস্যা নয়; বরং পুরোনো সমস্যার বাস্তব প্রতিফলন।অর্থাৎ, প্রকৃত হিসাব সামনে আসা খারাপ খবর নয়। বরং সমস্যাকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই সমাধানের পথ তৈরি হয়।

শুধু ঋণ নয়, তারল্য ঝুঁকিও বাড়ছে:

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও বা এডিআর ১০০ শতাংশের বেশি।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ব্যাংক যত টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে, তার চেয়েও বেশি ঋণ দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমানতকারীরা একসঙ্গে টাকা তুলতে চাইলে ব্যাংক সংকটে পড়ে যেতে পারে। এটি ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে থাকে।

দায় শুধু ব্যাংকের নয়:

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কিংবা ঋণগ্রহীতাদের অবশ্যই দায় রয়েছে। কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, অনিয়মের বিরুদ্ধে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, লাইসেন্স প্রদানের সময় কী ধরনের যাচাই হয়েছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যাংক একদিনে দুর্বল হয় না। বছরের পর বছর অনিয়ম চলার সুযোগ তৈরি হলে তবেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে। তাই দায় নির্ধারণের পাশাপাশি নীতিগত জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একই ভুল ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

যখন কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নয়, পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার কার্যত পুরো ঋণপোর্টফোলিওকেই অচল করে দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং পদ্মা ব্যাংকে ৯০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এসব ব্যাংকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৯০ টাকারও বেশি নিয়মিতভাবে আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ, এসবিএসি ব্যাংকে ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংকে ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং মধুমতি ব্যাংকে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এখন কী করা প্রয়োজন:

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর জোর দিলেই হবে না। প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে গভীর কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অ-অর্থনৈতিক বিবেচনার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন ও দক্ষ পরিচালক নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা থাকে। তৃতীয়ত, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। চতুর্থত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক হতে হবে। অনিয়ম ধরা পড়ার পর নয়, বরং আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ঋণের আকার বা প্রভাবশালী পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন আচরণ করলে ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি কখনোই কমবে না।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14460 ,   Print Date & Time: Friday, 11 September 2026, 11:06:26 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh