![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই লক্ষ্য অর্জনে দেশের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম তামাক শিল্পে বিশেষ অভিযান, বড় অঙ্কের কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়ে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে কর্মকর্তারা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক স্থবিরতা এবং কর আদায়ের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরলেও এনবিআরের শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেয়।
তামাক খাতে বাড়ছে নজরদারি
সরকারি রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস তামাক খাত। প্রতি বছর এই খাত থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আসে। কিন্তু জাল সিগারেট, অবৈধ তামাকপণ্য এবং চোরাচালানের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু এবং তামাক কারখানাগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে এনবিআর।
বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ
বৈঠকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংশ্লিষ্ট ২৩টি বড় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব মামলার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত ৬৬ হাজার করদাতার অডিট ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এনবিআরের মতে, এসব অডিট শেষ হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
মাঠ কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
যদিও এনবিআরের পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী, তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
তাদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর আদায়ে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া ভ্যাট আদায়ের সময়সীমা মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তারা মত দেন।
কর্মকর্তাদের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ
বৈঠকে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং কর্মকর্তাদের মনোবল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আন্দোলন, বদলি, বরখাস্ত এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে রাজস্ব আদায়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর তালিকা এক সপ্তাহের মধ্যে এনবিআরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি মতবিনিময় সভা আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যা আগামী ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।
এছাড়া এনবিআরের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রতি সপ্তাহে একদিন এনবিআর কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম তদারকি করবেন বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শুধু অভিযান নয়, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।