![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। রপ্তানিকারক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মতে, আগামী কয়েক মাসেও এই খাতের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে খুচরা বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিক্রেতার কাছে এখনও বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত পোশাকের মজুত রয়েছে। এ কারণে তারা নতুন করে বড় পরিসরে ক্রয়াদেশ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের পোশাক শিল্পেও পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পোশাকের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে দেশে গ্যাস সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা কারখানাগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সায়েম গ্রুপের পরিচালক আবরার এইচ সায়েম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং ক্রেতাদের অতিরিক্ত মজুতের কারণে নতুন অর্ডারের প্রবাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না।
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে বড় পরিসরের নতুন ক্রয়াদেশ আসছে না। যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আগের অবিক্রীত পণ্যের মজুত—সবকিছুই ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
স্কয়ার অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরীর মতে, পশ্চিমা বাজারের ভোক্তারাও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। ফলে পোশাক কেনার প্রবণতা কমেছে। তিনি বলেন, দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং শিল্প কিছুটা স্বস্তি পাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনও সীমিত সংখ্যক পণ্যের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭৮ শতাংশ আসে মাত্র পাঁচ ধরনের পণ্য—ট্রাউজার, টি-শার্ট, বোনা কাপড়ের ফরমাল শার্ট, অন্তর্বাস এবং সোয়েটার থেকে। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানাও মূলত এসব পণ্য উৎপাদন করে থাকে। ফলে বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, শুধুমাত্র মৌলিক ধরনের পোশাক উৎপাদনের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল এখন আর কার্যকর নয়। ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলো সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে চলে গেছে। তিনি উৎপাদন ব্যয় কমাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, উৎপাদন ব্যয়, মূল্য সংযোজন এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম বর্তমানে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এবং পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও একই মত। তাদের মতে, উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ না দিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) হারালে বাংলাদেশের পোশাক আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
এদিকে নতুন বাজার ও নতুন ক্রয়াদেশ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটির পরিচালক ফয়সাল সামাদ জানান, আগামী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় একাধিক রোডশো আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড এবং পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে রপ্তানিকারকদের সহায়তার জন্য একটি আধুনিক ডিজাইন স্টুডিওও গড়ে তোলা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে শুধু নতুন বাজার খোঁজা নয়, বরং উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে।