![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, ঢাকাসহ দেশে গ্যাসের চাপ কমে চরম ভোগান্তি
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শিল্প-কারখানাগুলোও তীব্র সংকটে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটি গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এ অবস্থায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং আশপাশের জেলাগুলোতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাসাবাড়িতে দিনের বড় সময় রান্নার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তিতে চালক ও যাত্রী
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস নিতে পারছেন না। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
রাউজানের সিএনজি অটোরিকশাচালক তাজু উদ্দিন জানান, কয়েক দিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক সময় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এতে দৈনিক আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।
শিল্প উৎপাদনেও বড় ধাক্কা
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও মানিকগঞ্জের প্রায় ২০০টিরও বেশি টেক্সটাইল, স্টিল এবং সিরামিক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দৈনিক ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের পরিবর্তে বর্তমানে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়েছে।
মেরামতে কাজ করছেন বিদেশি বিশেষজ্ঞরা
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় প্রকৌশলীদের সঙ্গে যৌথভাবে টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন।
জানা গেছে, টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে একটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি অক্ষত বয়লারটি আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সচল করা যায়, তাহলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে। তবে পুরো টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার আশা
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির জানান, সাধারণ সময়ে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, বিদেশি ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেরামতের কাজ চলছে এবং যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এলএনজি টার্মিনালের মেরামত দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।