![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দে বিশেষ সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র: প্রতিবেদন
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে বিশেষ স্থল অভিযান পরিচালনার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। অভিযানের লক্ষ্য হবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিরাপদে সরিয়ে আনা।
শনিবার (২৫ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য এই অভিযান বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন যৌথ বাহিনীর সবচেয়ে জটিল ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ সামরিক অভিযানের একটি।
প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইস্ফাহান, ফোর্ডো এবং নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’-এর মতো শক্তিশালী সুরক্ষাবেষ্টিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের জন্য হাজার হাজার স্থলসেনার প্রয়োজন হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ বাহিনীকে প্রথমে মাইন ও বিস্ফোরক ফাঁদ এড়িয়ে নিরাপদ করিডোর তৈরি করতে হবে। এরপর বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ পুনরায় খুলতে বিশেষ প্রকৌশলী ও খনন দল মোতায়েন করা হতে পারে। মূল বাহিনী চারপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, আর ছোট একটি বিশেষ অপারেশন দল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে ইউরেনিয়াম উদ্ধারের কাজ সম্পন্ন করবে।
লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’
মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সম্প্রতি ইরান নাতাঞ্জের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে শত শত সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে পাশের পাহাড়ের নিচে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় স্থানান্তর করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিল টিম-৬-এর সিলভার স্কোয়াড্রন, দ্বিতীয় রেঞ্জার ব্যাটালিয়ন এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ ২১তম অর্ডন্যান্স কোম্পানি অংশ নিতে পারে।
আইএইএর হিসাব
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা শুরুর আগে ইরানের কাছে ২০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও রয়েছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে অস্ত্রমানের সমৃদ্ধকরণের খুব কাছাকাছি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ধারণা, ২০২৫ সালের জুনে চালানো বিমান হামলার পরও এসব ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ভূগর্ভস্থ স্থাপনা বা ধ্বংসস্তূপের নিচে অক্ষত থাকতে পারে।
সামরিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, সম্ভাব্য অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অংশ হবে সব স্থাপনার চারপাশে দ্রুত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা এবং বিশেষ বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। তার দাবি, ইরান ইতোমধ্যে এসব সুড়ঙ্গে মাইন ও বিস্ফোরক বসিয়েছে, ফলে আকস্মিক হামলার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক কম।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর কর্মকর্তা জোসেফ রজার্সের মতে, যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানই ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করার সম্ভাব্য একটি পথ হতে পারে। তবে তিনি এটিকে সামরিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও রসদনির্ভর অভিযান বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে গত জুনে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হলে ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে।
উল্লেখ্য, ইরানে সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযান সংক্রান্ত তথ্য মূলত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবির ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়নি এবং ইরানও এসব দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।