• হোম > দেশজুড়ে > তিন দশক পর আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় রূপগঞ্জবাসী

তিন দশক পর আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় রূপগঞ্জবাসী

  • শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১:২৩
  • ৬২

---

বিশেষ প্রতিনিধি

নব্বইয়ের দশকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের জন্য ভিটেমাটি ছেড়েছিলেন অনেক পরিবার। দীর্ঘ সংগ্রামের পর নতুন করে গড়ে তোলা বসতিই এখন আবার অনিশ্চয়তার মুখে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের শিমুলিয়া ও মুলাদী গ্রামের মানুষ দ্বিতীয়বার উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। নতুন করে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ায় শতাধিক পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করলেও নিজেদের শেষ আশ্রয় রক্ষার দাবি তুলছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একটি সরকারি সংস্থা দুই গ্রামের প্রায় ৩৮ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অন্তত শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও জমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক আগে পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য জমি হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই তখন সামান্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। সেই স্মৃতি এখনও তাদের জীবনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। ফলে নতুন এই পরিস্থিতি তাদের মধ্যে পুরোনো আতঙ্ক ফিরিয়ে এনেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগের অধিগ্রহণে তারা পৈতৃক সম্পদের বড় অংশ হারিয়েছিলেন। ক্ষতিপূরণের সীমিত অর্থে মাত্র দুই থেকে পাঁচ শতাংশ জমি কিনে ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করেন। বর্তমানে এসব ঘরই তাদের পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আবারও উচ্ছেদ হলে নতুন করে কোথায় বসবাস করবেন, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই। বারবার ঘর হারানোর মানসিক ও আর্থিক চাপ বহনের সামর্থ্যও অধিকাংশ পরিবারের নেই বলে তারা জানিয়েছেন।

নতুন অধিগ্রহণকে ঘিরে ক্ষতিপূরণের বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রস্তাবিত সরকারি মূল্য বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম। এই অর্থ দিয়ে আশপাশের এলাকায় নতুন জমি কিনে ঘর নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে ক্ষতিপূরণ পেলেও বাস্তবে পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত থাকবে। এ কারণে তারা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

দুই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। বসতভিটার পাশাপাশি চাষযোগ্য জমিও অধিগ্রহণের আওতায় এলে তাদের আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। এতে অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জমি হারানোর প্রভাব শুধু আবাসনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ জীবিকাকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণের আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। তারা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতি বর্তমান বসতিগুলো অক্ষত রেখে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি মানুষের স্থায়ী আবাসও সংরক্ষণ করা সম্ভব। এজন্য পরিকল্পনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে।

গ্রামবাসীর দাবি, পূর্বাচল এলাকায় এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খালি জমি এবং সরকারি খাস জমি রয়েছে। তাদের মতে, বসতিপূর্ণ এলাকা উচ্ছেদ না করে সেইসব জমিতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও এগিয়ে যাবে, আবার বহু পরিবার দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থেকেও রক্ষা পাবে। স্থানীয়রা মনে করেন, এই বিকল্প ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হবে।

শিমুলিয়া ও মুলাদী গ্রামের মানুষ এখন একটি স্থায়ী ও মানবিক সমাধানের প্রত্যাশায় রয়েছেন। তাদের আবেদন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দেওয়া হোক। তারা প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন সিদ্ধান্তের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে এবং একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্বিতীয়বারের মতো উদ্বাস্তু হওয়ার বেদনা থেকে রক্ষা পায়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14396 ,   Print Date & Time: Wednesday, 9 September 2026, 11:26:59 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh