![]()
মোহাম্মদ ইকবাল জামাল
এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন প্রেসিডেন্টদের মধ্য থেকে একজনকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে দ্রুত এফবিসিসিআই নির্বাচন সম্পন্ন করা জরুরী।
আন্দোলনের কারণে অন্তর্বর্তী কালীন সরকার এফবিসিসিআই’র বোর্ড ভেঙ্গে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও নির্বাচন বা এফবিসিসিআই পুনর্গঠনের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এফবিসিসিআই’কে কেন্দ্র করে ছোট বড় কয়েকটি প্রেশার গ্রুপ তৈরি হওয়ার ফলে ধারণা করা যায় যে, নিরপেক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তি পাওয়া নিয়ে সরকারও অনিশ্চিত ও দ্বিধান্বিত ছিলেন, তাই কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন প্রায় দুই বছর নেতৃত্ব শূন্য রয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ী ও সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দেশী ও বিদেশী নানা অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিষয়ে দরকষাকষিতে সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজ বঞ্চিত হচ্ছে। এখন ব্যবসায়ীরা তাদের কথা বলার প্রধান প্ল্যাটফর্ম থেকে বঞ্চিত। গত বছর নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক তরফা এফবিসিসিআই’র কিছু সংস্কার করে ব্যবসায়ীদের উপরে চাপিয়ে দেয়। তার আলোকে প্রশাসক নির্বাচন বোর্ড গঠন করে তফসিল ঘোষণা করে। মামলা ও বিভিন্ন জটিলতায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সংস্কারের কিছু বিষয় ছিল বিতর্কিত ও প্রশ্ন বিদ্ধ। এরপর আরও ১৪ মাস গত হয়েছে, আবার নতুন প্রশাসক এসে বিদায়ও নিয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। বর্তমানে কোন প্রশাসক নাই। প্রশাসক না থাকায় একটা সুবিধা হচ্ছে, শূন্যস্থানে একজন উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ কাউকে নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থেকে একজনকে প্রশাসক হিসাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
কিন্তু সংস্কারের নামে আর বিলম্ব না করে দ্রুত এফবিসিসিআই নির্বাচন দেয়া বাঞ্ছনীয়। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেকারত্ব দূরীকরণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারকে নীতি সহায়তা প্রদান সহ দেশি বিদেশী নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত এফবিসিসিআই নির্বাচনের বিকল্প নাই। তবে কথা থাকে, নির্বাচন হলেই কি সমস্যা গুলো তাৎক্ষণিক সমাধান হয়ে যাবে? না, তা হয়ে যাবে না। কেননা সেজন্য এফবিসিসিআই-এ যেমন যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি এর প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। এটা ২০২৬ সাল, এখনকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের দরকষাকষির সক্ষমতার অভাব রয়েছে। আজকে এফবিসিসিআই’র বোর্ড থাকলে অবশ্যই প্রধান মন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি থাকতো, যাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পেত। এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের এপেক্স বডি, এর বোর্ড না থাকায় বিদেশী বিনিয়োগেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, অথচ জ্বালানি সংকটে বহু ফ্যাক্টরি উৎপাদনে যেতে পারছে না (এতে বিদেশীদের কাছেও ভুল বার্তা যাচ্ছে)। জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। মন্দা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে বিদেশিদেরও ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় রফতানী অর্ডার কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্প কারখানা রুগ্ন ও ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ছে। রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ নির্ভর বাজেট আরও অনেক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ পেতে বাঁধা হবে। এমতাবস্থায় এসব বিষয় নিয়ে সফল ভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত যোগ্য নেতৃত্বের অভাব অবশ্যই রয়েছে বলে সকলের সাথে আমিও একমত।
এফবিসিসিআই নিয়ে যাঁরা বিগত তিরিশ বছর বা তারও অধিক সময় ধরে কাজ করছেন বা যুক্ত আছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, বিগত দিনের মত কাজের ধারা বর্তমানে আর কার্যকর না, মনে রাখতে হবে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধে রোগ ভালো হয় না। এটা তাঁরা বোঝেন বা না বোঝেন, এটাই সত্য। তবে তাঁরা এফবিসিসিআই’কে ভালোবাসেন সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নাই। কিন্তু নেতৃত্ব ছাড়ার মানসিকতা তাঁদের এখনও সেভাবে গড়ে উঠেনি। নইলে তাঁরা নিজেরা প্রার্থী না হয়ে বরং দেশের কথা বিবেচনা করে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করার উদ্যোগ নিতেন। সরকারও মনে হয় দ্বিধায় আছে কাকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দিবেন সেটা নিয়ে। হয়তো সরকার এমন একজন উপযুক্ত নেতৃত্ব অনুসন্ধান করছে যার আর্থিক খাতে সুনাম আছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব দানে সক্ষম, ব্যবসায়ী সমাজে যিনি সকল বিবেচনায় একজন সফল উদ্যোক্তা ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি। তাই অনুমেয় যে, বর্তমান সরকারের বয়স ৫ মাসের অধিক হলেও এফবিসিসিআই’র বিষয়ে একটু সময় নিচ্ছে যাতে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নির্ভুল ভাবে তেমন একজন নিষ্কণ্টক ও সফল উপযুক্ত নেতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়। উপযুক্ত ও প্রয়োজন বিবেচনায় বয়স ও অভিজ্ঞতা এ সরকারের কাছে মুখ্য না, মন্ত্রী পরিষদের সদস্যসহ যাকে যেখানে উপযুক্ত মনে করেছে, সরকার তাঁকেই সেখানে নিয়োগ দিয়েছে (হয়তো সরকার মনে করে একনিষ্ঠতা ও যোগ্যতা থাকলে দায়িত্ব একজন মানুষকে উপযুক্ত করে তুলবে), কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার সমসাময়িক তরুণ ব্যক্তিত্ব নিয়োগ দিয়ে সফল হয়েছে। তাই সংস্কারের নামে সময় ক্ষেপণ বা মামলা জটিলতা সৃষ্টি না করে আমাদের সকলেরই দ্রুত এফবিসিসিআই নির্বাচন অনুষ্ঠানে একমত প্রসন করা উচিৎ, অর্থাৎ সরকার যেভাবে চায় সেভাবেই নির্বাচন হতে দেয়া উচিৎ। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষতি হয়েছে, আর না, আসুন দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে সবাই মিলে আওয়াজ তুলি, বদলে যাও বদলে দাও। নতুন করে সাজো নতুন করে সাজাও।