![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চাঁদাবাজি, ঝুট (শিল্পবর্জ্য) দখল, ট্রাক ছিনতাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিল্পাঞ্চলে নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে নতুন করে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
শিল্পমালিকদের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, নির্ধারিত বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রিতে চাপ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি এবং পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলও এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তার মালিকানাধীন পেপার ও বোর্ড কারখানায় নিয়মিতভাবে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রির জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, কারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ারও চাপ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ভবিষ্যতে শিল্প খাত আরও বড় সংকটে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ভালুকায় দুই প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ
ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত দুটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
এনভয় টেক্সটাইলসের অভিযোগে বলা হয়েছে, কারখানার প্রধান ফটকের সামনে থেকে একটি পণ্যবাহী ট্রাক জোরপূর্বক ছিনতাই করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় ট্রাকটি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অভিযুক্তরা কারখানার ঝুট বের করতে বাধা এবং নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এসকিউ গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন ভেন্ডরের মাধ্যমে ঝুট অপসারণের সিদ্ধান্তের পর কোম্পানির কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি কারখানার প্রধান ফটকের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং মামলা দায়ের করেছে।
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একই ধরনের অভিযোগ
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের একাধিক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বাধ্য হয়ে ঝুট বিক্রি করতে হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত মূল্যের অনেক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং অন্য কাউকে পণ্য বিক্রি করলে ট্রাক আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের এক রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আগে যেমন ঝুট ব্যবসা নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, এখনও রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ আরও বেড়েছে এবং এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরেক উদ্যোক্তা বলেন, নাম প্রকাশ করলে কারখানার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই প্রতিশোধের আশঙ্কায় অধিকাংশ শিল্পমালিক প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তদের
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা অধিকাংশই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় যুবদল নেতা পরিচয় দেওয়া রিপন শিকদার বলেন, কাউকে জোর করে ব্যবসা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না। তার দাবি, অতীতে যেমন রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, এখনও বিভিন্ন পক্ষ এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
ভালুকার ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকেও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই তারা কাজ করছেন এবং কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নন।
টিআইবির উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, শিল্পখাতে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জবরদখলের অভিযোগ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তার মতে, এসব অনিয়ম দ্রুত বন্ধ করা না গেলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সাংগঠনিক অবস্থান নেওয়া এবং প্রশাসনের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
শিল্পখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চাঁদাবাজি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।