• হোম > বাংলাদেশ | মতামত > ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্টেশন, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্টেশন, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

  • বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫২
  • ৬৪

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ঢাকার অন্যতম প্রাকৃতিক ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস) নির্মাণকে ঘিরে পরিবেশগত উদ্বেগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন বিভাগ বলছে, সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গৃহস্থালি ও পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য জমা হলে শুধু বন নয়, পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে উদ্যানের ভেতরে প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ করছে। কেন্দ্রটি চালু হলে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার টন বর্জ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকবে বলে জানা গেছে।

তবে বন বিভাগের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বন বিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে রাস্তা তৈরি এবং নির্মাণকাজ চালানোর ঘটনাও সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, গত এপ্রিলে বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করতে গেলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে যৌথ পরিদর্শনে বনের একটি অংশে আগুন লাগানোর ঘটনাও সামনে আসে।

বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রিট করলে হাইকোর্ট ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের নির্দিষ্ট এলাকায় সব ধরনের নির্মাণকাজ এবং ছয় মাসের জন্য বর্জ্য ফেলা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। এরপরও স্থানীয় সূত্রের দাবি, নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রটি চালু হতে পারে।

বন বিভাগের আশঙ্কা

ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে যদি শিল্পবর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা, পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য, পচনশীল খাদ্য, সিরিঞ্জ, কাচের টুকরো ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য নিয়মিত ফেলা হয়, তাহলে পরিবেশ, বায়ু ও মাটির মারাত্মক দূষণ ঘটবে।

তার ভাষায়, এসব বর্জ্য খেয়ে বনের হরিণ, বুনো শূকর, বেজি, সরীসৃপ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রোগাক্রান্ত হতে পারে, এমনকি মারা যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। এতে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পে গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা শালবনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সিটি করপোরেশনের ব্যাখ্যা

অন্যদিকে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন বলছে, দ্রুত বর্ধনশীল নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত জমি না থাকায় তারা চরম সংকটে রয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, শহরের বর্জ্য কোথাও না কোথাও স্থানান্তর করতেই হবে। উপযুক্ত জমির অভাবে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, রাস্তায় বর্জ্য ফেলে রাখাও পরিবেশের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর।

পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা

পরিবেশবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হলেও যদি সেটি জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে থাকে, তাহলে সেখানে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর স্থাপনা নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলছেন, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শুধু গাজীপুর নয়, পুরো মধ্যাঞ্চলের জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য এবং কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রটি চালু হলে দুর্গন্ধ, বিষাক্ত লিচেট, প্লাস্টিক দূষণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো ভাওয়াল বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14224 ,   Print Date & Time: Sunday, 6 September 2026, 06:00:22 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh