• হোম > অর্থনীতি > কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থেই কি চলবে ব্যাংক?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থেই কি চলবে ব্যাংক?

  • মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ২১:৪১
  • ৮১

---

আহমেদ তোফায়েল

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে গত এক দশকে যত আলোচনা হয়েছে, তার বড় অংশজুড়েই ছিল খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ কিংবা অনিয়মের অভিযোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি শব্দ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে—তারল্য। একটি ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকলে আমানতকারীকে অর্থ ফেরত দেওয়া, দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা কিংবা নিয়মিত আর্থিক দায় পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারল্য শুধু একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থারও প্রতিফলন।

জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন ব্যবস্থায় চার লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। একক মাসে এটি সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন এত বড় পরিসরে অর্থ সরবরাহ করতে বাধ্য হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—ব্যাংকগুলো কি সাময়িক চাপ সামলাচ্ছে, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে আটকে পড়েছে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু…

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক শেষ আশ্রয়দাতা বা Lender of Last Resort হিসেবে কাজ করে। কোনো ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি তারল্য সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো, স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি কিংবা অন্যান্য ব্যবস্থায় অর্থ সরবরাহ করে। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ।

বাংলাদেশেও রেপো, স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি এবং স্পেশাল লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঋণের মেয়াদ একদিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে দ্রুত তা ফেরত দেয়।

তাই শুধু সহায়তার পরিমাণ দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয় তখনই, যখন সহায়তার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে কিংবা একই ধরনের কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে আস্থা:

ব্যাংকিং খাতে অর্থের সংকটের চেয়েও বড় সংকট হলো আস্থার সংকট। গত কয়েক বছরে দেশের কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পরিচালনাগত ব্যর্থতার খবর নিয়মিত প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, প্রয়োজনে নিজের জমা অর্থ নিরাপদে পাবেন তো?

জুন মাসে ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান নিয়োগ-সংক্রান্ত অস্থিরতা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক গ্রাহক একসঙ্গে আমানত তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটিই ব্যাংকিংয়ের ভাষায় ‘রান অন দ্য ব্যাংক’ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

একটি ব্যাংক কখনোই সব আমানত নগদ হিসেবে সংরক্ষণ করে না। আমানতের বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। ফলে হঠাৎ বিপুলসংখ্যক গ্রাহক অর্থ তুলতে এলে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকও চাপে পড়ে যেতে পারে। সেই জায়গায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যার মূল শুধু অর্থের নয়; আস্থারও।

দুর্বল ব্যাংকের দীর্ঘ নির্ভরতা:

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো সাধারণত রেপোর মতো নিয়মিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তারল্য সংগ্রহ করে। অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলো বিশেষ তারল্য সুবিধির ওপর বেশি নির্ভরশীল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

যদি কোনো ব্যাংক নিয়মিত আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে না পারে, তবে বোঝা যায় অন্য ব্যাংকগুলোও তাকে সহজে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে নয়; পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারভিত্তিক অর্থায়নের বদলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এটি কোনো সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষণ নয়।

কলমানি বাজার কী বলছে:

জুন মাসে আন্তঃব্যাংক কলমানি বাজারেও লেনদেন বেড়েছে। সাধারণত ব্যাংকগুলো প্রথমে এই বাজার থেকেই স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে। লেনদেন বৃদ্ধি একদিকে দেখায় যে বাজারে অর্থের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে এটিও বোঝায়, ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় বেশি তারল্য খুঁজছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ব্যাংক সমানভাবে এই বাজারে অর্থ পায় না। যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী এবং বিশ্বাসযোগ্য, তারা সহজেই অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। দুর্বল ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকেই তাকিয়ে থাকে।

তারল্য সংকটের পেছনে আরও কিছু কারণ:

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে শুধু একটি বা দুটি কারণ কাজ করছে না। প্রথমত, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স। দ্বিতীয়ত, উচ্চ খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের দেওয়া ঋণ সময়মতো ফেরত না এলে নতুন আমানত দিয়েই পুরোনো দায় সামাল দিতে হয়। তৃতীয়ত, কিছু ব্যাংকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ব্যাংক ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতাকে দুর্বল করেছে। চতুর্থত, গ্রাহকদের মধ্যে তথ্যের দ্রুত বিস্তারও এখন বড় বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমানত প্রত্যাহারের চাপ তৈরি হতে পারে। এসব কারণে তারল্য ব্যবস্থাপনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব সহজ নয়। একদিকে তাকে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় তারল্য দিতে হবে, যাতে কোনো ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম বন্ধ না হয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত সহায়তা দিয়ে এমন বার্তাও দেওয়া যাবে না যে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা করলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্ধার করবে। অর্থনীতিতে এটিকে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ বলা হয়। অর্থাৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের পরও যদি উদ্ধার নিশ্চিত থাকে, তাহলে সংস্কারের চাপ কমে যায়। তাই স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তার পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর তদারকি, পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ:

ব্যাংকিং খাতে আস্থা কোনো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। এটি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক সুশাসনের মাধ্যমে।

এর জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, খেলাপি ঋণ আদায়ে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমানতকারীদের এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাঁদের অর্থ নিরাপদ।

বর্তমান পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিল, তারল্য সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। একজন রোগীকে স্যালাইন দিয়ে সাময়িকভাবে সুস্থ রাখা সম্ভব, কিন্তু রোগের কারণ দূর না করলে বারবার একই সমস্যা ফিরে আসে। ব্যাংকিং খাতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়। যদি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আসে, যদি সুশাসনের ঘাটতি দূর না হয়, যদি দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন না হয় এবং যদি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভবিষ্যতেও বারবার একই ধরনের বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিতে হতে পারে।

পরিশেষে, চার লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তার খবরকে শুধু একটি বড় অঙ্কের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। তবে এটিও সত্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা দেওয়া মানেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না।

বরং এই ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। কারণ সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থে টিকে থাকে না; টিকে থাকে জনগণের আস্থা, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর। সাময়িক তারল্য সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দরজায় বারবার কড়া নাড়ার প্রয়োজনই না পড়ে। সেটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14182 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 03:28:04 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh