![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব, হস্তক্ষেপ কিংবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নতুন নয়। ক্ষমতায় থাকা দল যেমন বিরোধীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছে, তেমনি বিরোধীরাও বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বিদেশি শক্তির প্রভাবাধীন বলে আখ্যায়িত করেছে। ফলে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ অনেকটা রাজনৈতিক অভিধানের স্থায়ী শব্দে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতি ‘দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালিত হচ্ছে—এমন বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এমন বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এর প্রভাব কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক?
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সমালোচনা অবশ্যই থাকবে। বিরোধী দল সরকারের নীতি, কূটনৈতিক অবস্থান কিংবা পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করতেই পারে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি বিদেশি রাজধানীর ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এমন অভিযোগ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নির্বাচিত সরকারের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাই এ ধরনের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্য ও প্রমাণের ওপর।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের প্রভাব রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা, পানি বণ্টন, জ্বালানি সংযোগ কিংবা আঞ্চলিক কূটনীতির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশও বাংলাদেশের সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিই স্বাভাবিক।
কিন্তু একটি দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং সেই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বড় রাষ্ট্রগুলো ছোট বা মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে সরাসরি ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বলে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি সরলীকৃত হয়ে যায়। এমন গুরুতর দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী, যাচাইযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য।
এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বৈপরীত্যও রয়েছে। যে রাজনৈতিক দল সম্প্রতি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং নির্বাচনের ফলও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেনি, তাদের পক্ষ থেকেই এখন যদি বলা হয় দেশের রাজনীতি বিদেশি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। যদি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই স্বাধীন না হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা কী?
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতেই পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে সুস্পষ্ট যুক্তি ও ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। অন্যথায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।
নির্বাচনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে আবারও আন্দোলন ও রাজপথের কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারের সমালোচনার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংসদ থেকে সরে গিয়ে পুরোপুরি রাজপথে স্থানান্তরিত হয়েছে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে। সংঘাত বেড়েছে, প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন রয়েছে।
যদি কোনো রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে যে জনগণের সমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে, তাহলে সেই সমর্থনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সাংবিধানিক পরীক্ষা হলো নির্বাচন। গণআন্দোলনের একটি বৈধ ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু সেটি কখনোই জনগণের ভোটের বিকল্প হতে পারে না।
বর্তমান বিশ্বে কোনো রাজনৈতিক দল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না। রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশি কূটনীতিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংগঠন কিংবা বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এটিই আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই বাস্তবতায় যদি কোনো দল নিজে আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে, তবে প্রতিপক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কেবল ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা নীতিগতভাবে অসঙ্গত হয়ে পড়ে। একই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়াই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতি, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ—সবকিছুই আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে। কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত জনমতকে প্রভাবিত করবে, এটিই স্বাভাবিক। তবে অতীতের দায় যেমন রয়েছে, তেমনি বর্তমানের দায়িত্বও রয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য শুধু প্রতিপক্ষের সমালোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতিগত অবস্থান, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা।
আজ বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিতর্কের চেয়ে অনেক বড়। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং সাংবিধানিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলো নাগরিক জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক নীতিগত বিতর্ক। যদি প্রতিটি সমস্যার ব্যাখ্যা কেবল বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত সমস্যাগুলোর সমাধান আড়ালেই থেকে যাবে। এতে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়বে, কিন্তু নীতিগত অগ্রগতি হবে না।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হয় নির্বাচন, জবাবদিহি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তথ্যনির্ভর বিতর্ক এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে। প্রমাণহীন অভিযোগ কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সমর্থকদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে থাকবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, সমালোচনার সঙ্গে থাকবে বিকল্প নীতি এবং প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হবে জনগণের ভোট। সরকার তার বৈধতা অর্জন করে জনগণের ম্যান্ডেট থেকে, আর সেই ম্যান্ডেট পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথও নির্ধারিত—অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
রাজনীতি যদি তথ্যের বদলে ষড়যন্ত্রের ভাষায় পরিচালিত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি দল বা সরকার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা। তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন অভিযোগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। সেটিই হবে দায়িত্বশীল গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।