![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক বিতর্ক এবং বৈশ্বিক বিভাজনের আবহে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত এমন এক বার্তা দিয়ে বিদায় নিল, যা কেবল ফুটবলই দিতে পারে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য এবং মানবিক আচরণই হয়ে উঠল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় অর্জন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় স্পেন। তবে শিরোপা জয়ের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফুটবলের সৌন্দর্য এবং খেলোয়াড়দের সম্মানবোধ।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেন কৌশলগতভাবে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয়। পুরো ম্যাচজুড়ে লিওনেল মেসিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখতে সক্ষম হয় স্প্যানিশ রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠ। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে লুই দে লা ফুয়েন্তের দল।
ম্যাচের আগে টানেলে অপেক্ষার সময় লিওনেল মেসি নিজেই এগিয়ে গিয়ে স্পেনের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেন। আর শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা যায় আরেকটি হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল এগিয়ে গিয়ে মেসিকে জড়িয়ে ধরেন, পিঠে হাত রেখে সম্মান জানান। বার্সেলোনার দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই তারকার সেই মুহূর্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করে।
বিশ্বকাপ চলাকালে মাঠের বাইরের নানা বিতর্কও আলোচনায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা, ইরানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এবং স্বাগতিক দেশের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়। তবে প্রতিবারই মাঠের রোমাঞ্চকর ফুটবল সেই বিতর্কগুলোকে আড়াল করে দেয়।
স্পেনও টুর্নামেন্টের শুরুতে বিতর্কের মুখে পড়েছিল। মুসলিমবিরোধী স্লোগানের অভিযোগে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন তদন্তের মুখোমুখি হলেও লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ও নৈপুণ্য শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা নানা সমালোচনার মুখে পড়লেও লিওনেল মেসির শিল্পসম ফুটবল এবং ফাইনালের পর তার আবেগঘন বিদায় সেই সব বিতর্ককে অনেকটাই ছাপিয়ে যায়।
বিশ্বকাপজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা পেয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, আরলিং হালান্ড এবং লামিন ইয়ামালের মতো তারকারা নিজেদের স্বকীয় পারফরম্যান্সে টুর্নামেন্টকে রাঙিয়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে উঠে এসেছে অনুপ্রেরণার বহু গল্প, যা ফুটবলের মানবিক দিককে আরও উজ্জ্বল করেছে।
ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানবান্দের সংগ্রামী জীবন কিংবা কানাডার অধিনায়ক আলফনসো ডেভিসের শরণার্থী থেকে জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়ে ওঠার গল্প বিশ্বকাপকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। একইভাবে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মাকে ঘিরে আবেগঘন ঘটনাও বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হওয়ায় ফুটবলকে প্রায়ই রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় টেনে আনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরলতা। ২২ জন খেলোয়াড়, একটি বল এবং কোটি মানুষের আবেগ—এই সমীকরণই বিশ্বকাপকে অন্য সব আয়োজন থেকে আলাদা করে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বার্তা হয়ে উঠেছে একটি বিষয়ই—সব বিতর্ক, বিভাজন ও মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক করতে পারে ফুটবল। স্পেনের বিশ্বজয় যেমন ইতিহাসে জায়গা করে নিল, তেমনি মেসি ও ইয়ামালের পারস্পরিক সম্মান, খেলোয়াড়দের মানবিক আচরণ এবং মাঠের সৌন্দর্য বিশ্বকাপটিকে স্মরণীয় করে রাখবে বহু বছর।