![]()
বাংলাদেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে টেক্সটাইল শিল্প, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটে মারাত্মক চাপে রয়েছে। একটি স্পিনিং মিলের মালিক খোরশেদ আলম জানান, তার কারখানার জন্য অনুমোদিত গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই হলেও গত সাড়ে চার বছর ধরে গড়ে মাত্র ১.৫ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন। এতে তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। সংকট নিরসনে তিনি তিতাস গ্যাস, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলায় ৪৪টি চিঠি দিলেও কোনো সমাধান পাননি। বাধ্য হয়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যাটারি স্টোরেজসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলেও তা কারখানার পূর্ণ উৎপাদন সচল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
একই সংকটে পড়েছেন রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে এম শহীদ রেজা, যিনি তার টেক্সটাইল কারখানা বিক্রির উপায় খুঁজছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় সুতা ও কাপড় আমদানি সহজ হওয়ায় স্থানীয় শিল্প আরও চাপে পড়েছে।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ বলেন, বর্তমানে তারা মাত্র ১ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন, যা দিয়ে মেশিন চালানো সম্ভব নয়। ফলে চড়া দামে সিএনজি ব্যবহার করে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, প্রাকৃতিক গ্যাসে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৭.৫ থেকে ৮ টাকা, সেখানে সিএনজিতে তা বেড়ে ১৪ থেকে ১৫ টাকায় দাঁড়ায়। এলপিজিও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর বিকল্প নয়। তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক ডাইং ও প্রসেসিং কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় তারা ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্যাসের অভাবে সেটিও ব্যাহত হচ্ছে। মেহমুদের মতে, চীন ও ভারতে সরকার শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করলেও বাংলাদেশে সেই সহায়তা নেই, ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সংকট শুধু টেক্সটাইল খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরামিক, টায়ার ও ফুটওয়্যার শিল্পও একই সমস্যায় ভুগছে। ফার সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান উদ্দিন বলেন, দিনের বেলায় অনেক সময় তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ ১ পিএসআইয়ের নিচে নেমে যায়। উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে এলপিজি বা সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।
মেঘনা গ্রুপের টায়ার বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল বারী জানান, এক দশকেরও বেশি আগে গ্যাসের লোড বাড়ানোর আবেদন করা হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সিলেটের কারখানায় দিনে মাত্র ১৬ ঘণ্টা এবং মাসে ২৪ দিন গ্যাস পাওয়া যায়, যা ধারাবাহিক উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান জেনিস শুজের চেয়ারম্যান নাসির খান বলেন, তাদের প্রধান সমস্যা গ্যাস নয়, বরং অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ। পূর্বঘোষণা ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মেশিনের ক্ষতি হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বিদ্যুৎ সরবরাহের পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি প্রকাশের দাবি জানান, যাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প প্রস্তুতি নিতে পারে।
তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা এলএনজির ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্প গ্রাহকদের মাসিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ৪,৩৩০ এমএমসি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৩,৭৩৭ এমএমসিতে নেমেছে। একই সময়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিতাসের এক কর্মকর্তা জানান, এরপরও প্রতি মাসে শিল্পখাতে আরও প্রায় ৩০০ এমএমসি গ্যাস কম সরবরাহ করা হচ্ছে, ফলে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসচালিত ইঞ্জিন ও বয়লার সচল রাখতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ পিএসআই এবং পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। চাপ ৭-৮ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং বয়লার পর্যাপ্ত বাষ্প উৎপাদন করতে পারে না। আর ২ থেকে ৫ পিএসআই গ্যাসচাপে অধিকাংশ বড় শিল্পকারখানাই সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। এতে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায় এবং বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
স্পিনিং মিলের মালিক খোরশেদ আলম বলেন, তাদের ভর্তুকি নয়, বরং প্রয়োজন পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ। তার ভাষায়, “আমরা যে গ্যাসের জন্য বিল দিচ্ছি, সেটি ব্যবহার করার মতো চাপই শুধু চাই।”