• হোম > অর্থনীতি > অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি

অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি

  • শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৯:১৪
  • ৫৭

---

ই বাংলাদেশ প্রতিবেদক

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানামুখী সংকটের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। সরকারের সাম্প্রতিক একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের ইকোসক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় এই বিশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে। সেখানে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উত্তরণকাল পিছিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। প্রস্তুতির সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করতে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সাথে এ বিষয়ে যৌথ তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও নেপাল বৈশ্বিক ধাক্কা সামলাতে বাড়তি তিন বছর সময় চেয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিসংক্রান্ত কমিটি ইতোমধ্যে এই আবেদন অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাবটি এখন সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় অস্থিরতা চলছে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। একই সাথে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলো বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলে দেশীয় পণ্য রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর বর্তমানে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে তদন্ত করছে। একই সাথে শ্রম অধিকার ও শিশুশ্রম নিয়ে কড়া নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজারে অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের মনে তীব্র আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে দেশীয় বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। অংশীদারদের সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতেও বাড়তি সময় লাগবে।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হলে আন্তর্জাতিক সব বিশেষ সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত বিদ্যমান ছাড়ের সুবিধা আর থাকবে না। আঙ্কটাড এই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে বড় দুর্বলতা বলেছে।

মেধাস্বত্ব ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলে জীবনরক্ষাকারী দেশীয় ওষুধের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন করে দারিদ্র্য বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য খাতের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে বিগত বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সাল থেকে দেশের মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে আট শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ২০২৫ সালে চরম দারিদ্র্যের হার আরও বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। বর্তমানে মোট আমদানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থ এই খাতে ব্যয় হচ্ছে। বিগত অর্থবছরে তেল ও সারের পেছনে রেকর্ড পরিমাণ খরচ হয়েছে।

এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। ঋণ বিতরণ ও নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সরকারের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আর্থিক সক্ষমতা ভীষণভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সরকারি বিনিয়োগ সীমিত হচ্ছে।

শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশে ব্যবসার খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে মোট রপ্তানি আয় কমেছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণে সরকারের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে সরকারের নীতিগত সংস্কারের জন্য সময় প্রয়োজন। আগামী তিন বছরের মধ্যে টেকসই উত্তরণের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের অন্তত দুই বছর প্রস্তুতির সময় লাগবে।

বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে উত্তরণ ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। তাই একটি নির্বিঘ্ন ও টেকসই উত্তরণের জন্য সময়সীমা বাড়ানো জরুরি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14083 ,   Print Date & Time: Friday, 4 September 2026, 07:23:31 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh