• হোম > বাংলাদেশ > মোবাইল অ্যাপ ও ডার্ক ওয়েবে সক্রিয় মাদক চক্র, বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি

মোবাইল অ্যাপ ও ডার্ক ওয়েবে সক্রিয় মাদক চক্র, বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি

  • শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১৪:৫১
  • ৪৮

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তল্লাশি চৌকি স্থাপন এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেও আশানুরূপ ফল মিলছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিনই ইয়াবা, গাঁজা, আইস, কোকেন, কেটামিনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার এবং মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হলেও প্রযুক্তির কল্যাণে মাদক ব্যবসার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচালিত অভিযান এখন আর পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মাদক ব্যবসার বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে অনলাইনে। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, ডার্ক ওয়েব, ভার্চুয়াল নম্বর এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে মাদকের অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে, আর সরবরাহ এমনভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে যাতে ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি দেখা করার প্রয়োজনই না পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মাদক কারবার এখন আর শুধু সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধে রূপ নিচ্ছে। ফলে তদন্তের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন মাদক উদ্ধার করার পাশাপাশি এনক্রিপ্টেড চ্যাট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্লকচেইন লেনদেন, ক্লাউড ডেটা এবং ডার্ক ওয়েবের তথ্য বিশ্লেষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই অপরাধ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ডিএনসির অধিকাংশ কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ের অভিযানে ব্যস্ত থাকলেও অনলাইনভিত্তিক মাদক চক্র শনাক্ত ও বিশ্লেষণের জন্য বিশেষায়িত ইউনিট কার্যত নেই।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, কেবল অভিযান চালিয়ে এখন আর মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে একটি বিশেষ সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন সেল গঠন জরুরি। সেখানে ডিজিটাল ফরেনসিক, ডার্ক ওয়েব মনিটরিং, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স, সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্লেষণ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিংয়ে দক্ষ জনবল থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডি, সিটিটিসি, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক চক্র শনাক্ত ও ভেঙে ফেলা অনেক সহজ হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে এলএসডি, কেটামিন, আইস, ডিওবি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের সিনথেটিক মাদকের অর্ডার দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বই, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ কিংবা সাধারণ পার্সেলের ভেতরে বিশেষ কৌশলে এসব মাদক দেশে আনার চেষ্টা করা হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে হোম ডেলিভারি নিশ্চিত করা হয়।

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় পরিচালিত এক অভিযানে একটি গোপন কেটামিন উৎপাদন ল্যাবের সন্ধান পায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অভিযান চালিয়ে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কাঁচামাল এবং ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি একটি বৃহত্তর আন্তঃদেশীয় সিনথেটিক মাদক নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।

অন্য এক তদন্তে উঠে এসেছে, নতুন প্রজন্মের এমডিএমবি মাদক চক্র ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, ভুয়া আইডি এবং সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস তৈরি করেছিল। ‘ফ্লেভার’, ‘গেমিং টুল’ কিংবা ‘পোর্টেবল ডিভাইস’-এর মতো নিরীহ শব্দ ব্যবহার করে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হতো। এরপর হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপ্টেড চ্যাটে কোডওয়ার্ড, ইমোজি এবং লাইভ লোকেশনের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বলেন, বর্তমানে শুধু মোবাইল ফোন জব্দ করলেই তদন্ত শেষ হয় না। প্রয়োজন ডিভাইসের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ক্লাউড ডেটা সংগ্রহ, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ শনাক্ত, ডিজিটাল ওয়ালেটের লেনদেন বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা। এসব ক্ষেত্রে এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে তদন্তে সময় বেশি লাগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় বট, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা ও অবকাঠামো উন্নত করা না গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের মাদকবিরোধী লড়াই শুধু সীমান্ত পাহারা বা নিয়মিত অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সাইবার স্পেসে নজরদারি, ডিজিটাল ফরেনসিক, আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ই হবে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক সিন্ডিকেট দমনের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/14056 ,   Print Date & Time: Saturday, 5 September 2026, 03:59:42 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh