ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় কমাতে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-২ (ইআরএল-২) প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানিতে প্রায় ২০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। এর ফলে বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
গত ৭ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন-এর সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
সভায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউর রহমান জানান, প্রকল্পটির ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (এফআইআরআর) ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (ইআইআরআর) ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। তার ভাষায়, এই প্রকল্প চালু হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয় হবে, যা বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে সক্ষম। তবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে। ফলে দেশের মোট পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে।
সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং ২০৩০ সালের নভেম্বর নাগাদ এটি সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইএসডিবির ঋণ দুটি ধাপে ছাড় করা হবে। প্রথম ধাপে প্রায় ৫২০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ঋণ এবং ৬ লাখ ডলার কারিগরি সহায়তা অনুদান দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪৮৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করা হবে।
২০ বছর মেয়াদি এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে পাঁচ বছর। সুদের হার নির্ধারণ করা হবে ছয় মাসের সোফর (SOFR)-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৬ শতাংশ স্প্রেড যোগ করে। ৫ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী মোট সুদের হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪৪৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে বর্তমানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আইএসডিবির সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের কারণে বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর সভায় মত দেন, প্রকল্পটির বড় অংশের ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রায় হওয়ায় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নই সবচেয়ে যৌক্তিক হবে।
এদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএসডিবির প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করা হবে। এ কারণে ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করা হবে, যাতে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ঠিকাদার নির্বাচন করা সম্ভব হয়।
এই পদ্ধতিতে দরদাতারা একই সঙ্গে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব পৃথক খামে জমা দেন। প্রথমে কেবল কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব পরবর্তীতে খোলা ও যাচাই করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।