![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের একমাত্র পরিচালনাধীন এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটে মেট্রোরেলের ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি, একাধিক পিয়ারে ফাটল, রেললাইনে মরিচা, ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইনে স্ফুলিঙ্গ এবং রক্ষণাবেক্ষণে গুরুতর ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। অডিট কমিটির মতে, এসব ত্রুটির কারণে যাত্রী নিরাপত্তা এবং পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
সম্প্রতি প্রস্তুত হওয়া নিরাপত্তা অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শন করা বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৩ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ ৭৩০টি প্যাড ত্রুটিপূর্ণ। এসব ত্রুটির সঙ্গে ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত কম্পন, ঝাঁকুনি এবং যাত্রীদের ভ্রমণস্বাচ্ছন্দ্য হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ডিজাইনগত গতিতে চলতে পারছে না ট্রেন
অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে, এমআরটি লাইন-৬ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলার জন্য নকশা করা হলেও বর্তমানে ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। এমনকি কয়েকটি অংশে গতি নেমে এসেছে ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার পর্যন্ত।
কমিটি বলেছে, অতিরিক্ত কম্পন নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রী নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে গতিসীমা কমিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এতে মেট্রোরেলের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা এবং পরিবহন দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
পিয়ারে ফাটল ও বেয়ারিং প্যাডে গুরুতর সমস্যা
প্রতিবেদনে ২১.২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পুরো রুটের বিভিন্ন স্থানে পিয়ার হেড, কংক্রিট বেইজ এবং বক্স গার্ডারে দৃশ্যমান ফাটল শনাক্ত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি ও অস্বাভাবিক ধাক্কার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ৩৪১ নম্বর পিয়ারে ১ মিলিমিটারের বেশি ফাটলকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে অডিট কমিটি।
কমিটির মতে, এসব ত্রুটির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নকশাগত দুর্বলতা এবং ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জাপানি ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
ওভারহেড তারে স্পার্কিং, বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের শঙ্কা
নিরাপত্তা অডিটে মেট্রোরেলের ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে (ওসিএস) নিয়মিত বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্কিংয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এ ধরনের স্পার্কিং থেকে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা পুরো মেট্রোরেল সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
রোলিং স্টকেও একের পর এক ত্রুটি
অডিটে ট্রেনের রোলিং স্টকে একাধিক সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নির্ধারিত স্থানের আগেই ট্রেন থেমে যাওয়া (আন্ডারশুটিং)
- ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মিসঅ্যালাইনমেন্ট
- চাকার অতিরিক্ত ক্ষয় ও সম্ভাব্য ফাটল
- দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি
- প্যান্টোগ্রাফ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
এসব সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেন সেট সাময়িকভাবে পরিষেবা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণে বড় ঘাটতি
অডিট কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় পরিদর্শন যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেমের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম প্রয়োজনীয় মানে পরিচালিত হচ্ছে না।
এছাড়া ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি চুইয়ে পড়া, বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষতি এবং ভূমিকম্প-সহনশীলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
দ্রুত পদক্ষেপের সুপারিশ
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম-এর নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের অডিট কমিটি বলেছে, এমআরটি লাইন-৬ বর্তমানে একটি “যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইল”-এর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
কমিটি জরুরি ভিত্তিতে—
- ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন,
- পিয়ার ও কংক্রিট কাঠামোর মেরামত,
- ডায়নামিক ভাইব্রেশন টেস্ট,
- স্মার্ট স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন,
- আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট,
- রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং
- পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে।
অডিট কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে গতি কমিয়ে এবং বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট বসিয়ে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা কেবল সাময়িক সমাধান। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধান না হলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমআরটি লাইন-৬ মূল নকশা অনুযায়ী পরিচালিত না হওয়ায় পরিবহন দক্ষতা, আয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।