• হোম > বাংলাদেশ > অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহি সংকুচিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে।

অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহি সংকুচিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে।

  • বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৬
  • ৩৬

অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহি সংকুচিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেই কোনো রাজনৈতিক দল চিরদিন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। সমালোচকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মেয়াদে বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয়েছে, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এসব সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এসব প্রশ্নের ভিত্তি হলো—যে মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই মূল্যবোধ যেন প্রতিটি সরকারের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার অধিকার দেয়নি; বরং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ইতিহাসের অন্যান্য গণআন্দোলনের মতো এটিকেও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে এবং এতে নিজেদের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, কোনো গণআন্দোলনের একক মালিকানা কোনো রাজনৈতিক দল দাবি করতে পারে না।

একটি গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি থাকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে—শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, পরিবার, পেশাজীবী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের সম্মিলিত প্রত্যাশায়। তাই জুলাইয়ের ঘটনাবলির মূল্যায়নও কেবল রাজনৈতিক কৃতিত্বের হিসাব দিয়ে নয়; বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়েছে কি না, নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়েছে কি না, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিস্তৃত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত থাকবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যেসব রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের ভূমিকা স্মরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ এগোতে পারে না। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, গণতন্ত্রের ভিত্তি কেবল অতীতের বিচার নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করার উপায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরস্থায়ীভাবে বর্জন করা নয়; বরং এমন একটি আত্মবিশ্বাসী গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে মতভিন্নতাকে শত্রুতা নয়, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক ধরনের বৈপরীত্যও রয়েছে। যে জাতি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতিকেই পরবর্তী সময়ে বারবার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়েছে। যে আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী রাজনৈতিক শক্তিকেও কখনো কখনো একই অধিকার সীমিত করার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এটাই সম্ভবত রাষ্ট্র নির্মাণের চিরন্তন বাস্তবতা। স্বাধীনতা কোনো যাত্রার শেষ নয়; বরং প্রতিটি প্রজন্মের সামনে নতুন দায়িত্ব। প্রতিটি প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোকে ধারণ করবে, নাকি সেগুলো থেকে বিচ্যুত হবে।

ফরমান আলীর নামে প্রচলিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজকে লালে রাঙাতে হবে’ উক্তিটি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। সেই শিক্ষা হলো—যখন একটি সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে অস্বীকার করে এবং সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগকে বেছে নেয়, তখন রাষ্ট্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কখনোই সেই পথে হাঁটা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের আধিপত্যে নয়; বরং সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য জনগণকে নীরব করা নয়, তাদের সেবা করা।

বাংলার সবুজ ভূমি এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের। সেই সবুজকে রক্ষা করার দায়িত্বও সবার। অতীতের আত্মত্যাগ স্মরণ করার পাশাপাশি প্রতিদিন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও জবাবদিহির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই হবে ১৯৭১ সালের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। কারণ তাঁরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশ কেবল স্বাধীন ভূখণ্ড নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের অধিকারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13897 ,   Print Date & Time: Monday, 7 September 2026, 08:44:26 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh