![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবানের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাড়ে ১২ হাজারের বেশি পরিবার। বন্যা থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সামিউল ফেরদৌস।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত চলমান বন্যা পরিস্থিতি বিষয়ক প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ভবিষ্যতে বান্দরবানকে বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, নদী খনন, খাল পুনঃসংস্কার এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।
তিনি জানান, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে যায়। যদিও মঙ্গলবার সকালে নদী দুটির পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসের কারণে জেলায় ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১১টি ছিল বড় আকারের। পৃথক ভূমিধসে লামা উপজেলায় পাঁচজন এবং পানিতে ডুবে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভূমিধস ও গাছ পড়ে অন্তত ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অধিকাংশ সড়ক পুনরায় চালু করা হয়েছে।
বন্যায় জেলার সড়ক অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডির প্রায় ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি চারটি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার মধ্যে একটি সচল করা হলেও বাকি তিনটির সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে।
বর্তমানে জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে আশ্রয় নিয়েছেন ২ হাজার ৫৮২ জন মানুষ। এছাড়া প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার এখনও পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লামা পৌর এলাকা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলা। জেলার মোট ৩৪টি ইউনিয়ন বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী, ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া নগদ সহায়তা বিতরণের পাশাপাশি আরও তিন হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে।
পর্যটন পরিস্থিতি নিয়েও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যার কারণে থানচি ও রুমায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম গঠন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, সাপের কামড়ের এন্টিভেনম, বিশুদ্ধ পানি এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য বিশেষ নকশার গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী খনন, বান্দরবান সদর পৌর এলাকার ম্যাকসি খাল দখলমুক্ত করে সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সড়ক উঁচু করা।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার সময় দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য ৩ হাজার টাকা করে গৃহ মেরামত অনুদান চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।