• হোম > বাংলাদেশ > কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে গণতন্ত্র?

কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে গণতন্ত্র?

  • মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:০২
  • ৬৬

---

ইতিহাসের বুকে কিছু শব্দ কেবল কথা নয়। এগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় ও মানসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফরমান আলীর নামে একটি উক্তি প্রচলিত আছে। উক্তিটি হলো—‘পূর্ব পাকিস্তানের জমিনের সবুজকে লালে রাঙাতে হবে।’ এই উক্তির সত্যতা বা উৎস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে ১৯৭১ সালের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের প্রতীক হিসেবে এটি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

বাঙালি জাতির মুক্তির লড়াইয়ে ১৯৭১ সাল শুধু একটি যুদ্ধের বছর নয়। এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের নাম। বাংলার সবুজ ভূখণ্ড সত্যিই রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। সেই রক্ত ছিল ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের। একটি গণতান্ত্রিক রায়কে অস্বীকার করার সিদ্ধান্তই বাঙালিকে সশস্ত্র সংগ্রামে ঠেলে দেয়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি। তারা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে তারা শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিস্থিতি ভয়াবহ সংকটের দিকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।

অভিযানের শুরু থেকেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ড ছিল সেই বর্বরতার বড় উদাহরণ। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা চালানো হয়। ফলে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হন।

এই দমন-পীড়নে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একা ছিল না। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে রাজাকার, আলবদর ও আল-শামস বাহিনী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘের’ বহু কর্মী এসব বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের এই ভূমিকা ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

সহযোগী বাহিনীগুলো কেবল সামরিক সহায়তা দেয়নি। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সাহায্য করে। তারা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তারা সুপরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করে। এটি ছিল ইতিহাসের এক চরম ট্র্যাজেডি। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদদের হত্যা করা হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের মেধা ধ্বংস করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ১৯৭১ কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার জন্য কত বড় মূল্য দিতে হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের মধ্যে। বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে। তাই মুক্তিযুদ্ধ ছিল যেমন জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, তেমনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও সংগ্রাম।

স্বাধীনতার চেতনা কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা জনগণের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এটাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমাদের রাজনৈতিক পথ সবসময় এই আদর্শের সাথে মেলেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং জবাবদিহিতা সংকুচিত করার প্রবণতা দেখা গেছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও ত্যাগ অনস্বীকার্য। তবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেই কোনো দল সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। সমালোচকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মেয়াদে বিরোধী রাজনীতির পথ সংকুচিত হয়েছে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এসব সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এই প্রশ্নের ভিত্তি হলো আমাদের প্রতিষ্ঠার মূল চেতনা। যে মূল্যবোধের জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তা প্রতিটি সরকারের জন্য সমান হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার অধিকার দেয় না। বরং এটি জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নৈতিক ভিত্তি দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য আন্দোলনের মতো এটিকেও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে। তারা এতে নিজেদের অবদান বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো, কোনো গণ-আন্দোলনের একক মালিকানা কোনো দল দাবি করতে পারে না।

একটি গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি থাকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে। জুলাইয়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছিলেন। তাই এই আন্দোলনের মূল্যায়ন কোনো রাজনৈতিক কৃতিত্বের হিসাব দিয়ে হবে না। এর মূল্যায়ন হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে। নাগরিক স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর সফলতা আসবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের ভূমিকা মনে রাখা জরুরি। ইতিহাসকে ভুলে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কেবল অতীতের বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং জনগণের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা।

স্বাধীনতার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় প্রতিপক্ষকে চিরকাল বর্জন করা নয়। বরং এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না। মতভিন্নতাকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। যে জাতি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা এনেছে, তাকেই আবার বারবার কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে। যে আন্দোলন অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল, তার নেতৃত্বদানকারী শক্তিও কখনো কখনো অধিকার সীমিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে।

এটাই রাষ্ট্র নির্মাণের চিরন্তন বাস্তবতা। স্বাধীনতা কোনো যাত্রার শেষ নয়। প্রতিটি প্রজন্মের সামনে এটি নতুন দায়িত্ব নিয়ে আসে। প্রতিটি প্রজন্মকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় তারা মূল নীতিগুলো ধরে রাখবে নাকি তা থেকে সরে যাবে।

মেজর জেনারেল ফরমান আলীর সেই কথিত উক্তি নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে ১৯৭১ সালের মূল শিক্ষা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। যখন কোনো সরকার জনগণের রায়কে অস্বীকার করে এবং সংলাপের বদলে বলপ্রয়োগ বেছে নেয়, তখন রাষ্ট্র বিপর্যয়ের দিকে যায়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কখনই সেই ভুল পথে হাঁটা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো নির্দিষ্ট দলের আধিপত্যে নেই। এটি নিহিত রয়েছে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকারের মধ্যে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য জনগণকে নীরব করা নয়, তাদের সেবা করা।

এই সবুজ ভূমি এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের। এই সবুজকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। অতীতের আত্মত্যাগ স্মরণ করার পাশাপাশি আমাদের প্রতিদিন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। তবেই ১৯৭১ সালের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে। কারণ, তাঁরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে জনগণের অধিকারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13843 ,   Print Date & Time: Tuesday, 8 September 2026, 02:40:17 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh