• হোম > অর্থনীতি | বাংলাদেশ > ত্রিমুখী সংকটে অর্থনীতি: পাঁচ মাসের মাথায় বড় পরীক্ষার মুখে সরকার

ত্রিমুখী সংকটে অর্থনীতি: পাঁচ মাসের মাথায় বড় পরীক্ষার মুখে সরকার

  • সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:২২
  • ৬৭

ত্রিমুখী সংকটে অর্থনীতি: পাঁচ মাসের মাথায় বড় পরীক্ষার মুখে সরকার

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এতে ঢাকা বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বন্যা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সেখানে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এই দুর্যোগ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বড় প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।

এই পরিস্থিতি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে। এটি চাপে থাকা জাতীয় অর্থনীতির ওপর নতুন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে সরকারের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র পাঁচ মাস আগে। সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাস স্বস্তির সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে। বিরোধী দলও অনেক ক্ষেত্রে সংযম দেখায়। বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীও অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করে। এর ফলে সরকার কিছুটা চাপমুক্ত পরিবেশে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ পায়।

কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। শুরু থেকেই তারা নানা সংকটের মুখে পড়েছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, তারা একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়েছে। সেখানে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছিল। সরকারের সমর্থকদের মতে, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতি পুনর্গঠন থমকে যায়। উল্টো শিল্প ও বেসরকারি খাত নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করে দেয়। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরে। ফলে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ নেয়। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তাদের সামনে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আগে থেকেই দুর্বল থাকা বেসরকারি শিল্প ও ব্যবসা খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎসকে দুর্বল করেছে। অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে ভোগব্যয় হ্রাস পাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক উদ্যোক্তা চলতি মূলধনের সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন, বিক্রি ও নতুন বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই চাপ এখন স্পষ্ট।

রপ্তানি আয়েও নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে। তৈরি পোশাক খাতেও আয় হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে আমদানি কিছুটা বাড়লেও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা কমেছে। এটি উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন সূচক ও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমে এসেছে। বিপরীতে সরকারের ঋণনির্ভরতা বেড়েছে। পুঁজিবাজারও এখনো প্রত্যাশিত গতি ফিরে পায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে না। অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানিও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। অর্থনৈতিক চাপের কারণে তাদের আয় ও মুনাফা কমে গেছে। ফলে তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রবেশ করেছেন। কিন্তু সেই তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার তাদের প্রথম বাজেট পাস করেছে। বাজেটে দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থপাচার রোধ, অপচয় কমানো এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই দেশব্যাপী বন্যা পরিস্থিতি নতুন করে সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। বন্যার কারণে কৃষিজমি, ফসল, গবাদিপশু ও মাছের খামার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য মজুত ও জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ইতোমধ্যে সংকটে থাকা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে উপস্থিত। এগুলো হলো—অতীতের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির অভিঘাত এবং বর্তমান বন্যাজনিত সংকট। এত বড় চ্যালেঞ্জ একা সরকারের পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় সংহতি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং দেশের সক্ষম নাগরিকদের একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সফল করতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

সরকারের দায়িত্ব হবে এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে বন্যা-পরবর্তী খাদ্য, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের জন্য এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ বহুবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কঠিন পরীক্ষা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। প্রতিবারই দেশের মানুষ অসাধারণ সহমমরিতা, ত্যাগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংকট অতিক্রম করেছে। এবারও সেই ঐক্য ও মানবিক শক্তিই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13793 ,   Print Date & Time: Tuesday, 8 September 2026, 08:07:05 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh