![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় দফা বিমান হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের পাঁচটি দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
রোববার (১২ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের দাবি, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন রাডার স্টেশন, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইরানের অভিযোগ, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেই ওয়াশিংটন এই হামলা চালিয়েছে। এর পরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার দাবি
ইরানের দাবি অনুযায়ী, ওমানের দুকম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর লজিস্টিক ও জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানার কথাও জানিয়েছে আইআরজিসি। যদিও কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন।
কুয়েতে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন দিয়ে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদের গুদাম এবং রাডার স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইরান।
বাহরাইনে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার কেন্দ্র লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে তেহরান।
এছাড়া জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে কমান্ড সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার না করায় প্রথমে একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি চালানো হয়। পরে আরও একটি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে নৌপথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে।
উত্তেজনার সূচনা যেভাবে
চলতি মাসের শুরুতে ওমান উপকূলের কাছে একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকারসহ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সেই ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বিমান হামলা শুরু করে।
পরে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
ইরানি হামলার পর কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কয়েকটি দেশে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কাতার এই হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে হামলার সব ধরনের দায় ইরানের ওপর বর্তাবে বলে জানিয়েছে দোহা।
ওমান বলেছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্ভাব্য সব হুমকি মোকাবিলায় সক্রিয় রয়েছে। বাহরাইনও নাগরিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।